Dhaka, Saturday, 15 August 2020

পুঁজিবাজার সুবাতাস বইবে কবে?

2020-06-24 13:35:35
পুঁজিবাজার সুবাতাস বইবে কবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আতঙ্কের মধ্যে টানা দরপতন ঠেকাতে দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর বা ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তিন মাসের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্তের কারণেই লেনদেন তলানিতে আটকে থাকছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকদের অনেকে।

পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে মত আছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চরম মন্দা পরিস্থিতি থেকে বাজারকে টেনে তুলতে হলে শেয়ার দরের সর্বনিম্ন সীমা তুলে দেওয়া প্রয়োজন, সেটা ধীরে ধীরে হলেও।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ফ্লোর প্রাইসের লাগাম অব্যাহত থাকলে পুঁজিবাজারে লেনদেন পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো ‘সুযোগ নেই’।

তিনি বলেন, “ফ্লোর প্রাইস তুলে দিতে হবে। তখন শেয়ারের চাহিদা তৈরি হবে, পুঁজিবাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে অর্থনীতির এই গবেষক বলেন, “এখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপের আগে শেয়ারের যা দাম ছিল এখন সেই দাম থাকবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে শেয়ারের দামে পরিবর্তন আসার কথা। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইস থাকার কারণে শেয়ারের দাম কমছে না, শেয়ার বিক্রিও হচ্ছে না। কারণ বেশি দামে কেউ শেয়ার কিনবে না।”

তিনি বলেন, বিশ্বের বড় বড় পুঁজিবাজার এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ফ্লোর প্রাইস থাকার কারণে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দাঁড়াতে পারেনি।

সূচকের পতন ঠেকাতে গত ১৯ মার্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি সার্কিট ব্রেকারের নিয়মে পরিবর্তন এনে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারের আগের পাঁচ দিনের ক্লোজিং প্রাইসের গড়কে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন দর হিসেবে বেঁধে দেয়। তবে দর বৃদ্ধিসহ অন্য ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকারের আগের নিয়ম বহাল রাখে।

ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেওয়ার পর পুঁজিবাজারে সূচকের পতন ঠেকলেও লেনদেন কমতে কমতে একদম তলানিত ঠেকেছে।

সর্বনিম্ন শেয়ার দর বেঁধে দেওয়ার পর ২২ মার্চ প্রথম কর্মদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ১৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকার শেয়ার। তিন মাস পর মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে তার অর্ধেক, ৭১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার।

এর মধ্যে রোববার ক্রেতার অভাবে ঢাকার পুঁজিবাজারে লেনদেন হয়েছে ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম, মাত্র ৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার। অথচ, এই বাজারে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ সোয়া তিন হাজার কোটি টাকার লেনদেনও হয়েছে।

সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস অব বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইওয়ার সাইদের মতে, পুঁজিবাজারকে টেনে তুলতে যত দ্রুত সম্ভব ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বাড়তি বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে।

তিনি বলেন, “ফ্লোর প্রাইস যতদিন তোলা না হবে ততদিন পুঁজিবাজারে ঠিকভাবে লেনদেন হবে না। এখন যে অবস্থা চলছে তাতে ব্রোকারেজ হাউজ চালানোর খরচটাও উঠে আসছে না।”

তবে ফ্লোর প্রাইস একবারে পুরোপুরি তুলে না দিয়ে ক্ষেত্র বিশেষে ছাড় দেওয়াসহ ধীরে ধীরে শিথিল করার পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এম সাদিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, লভ্যাংশ ঘোষণার সময় বা লাভ-ক্ষতির হিসাব প্রকাশের সময় কোম্পানির শেয়ার ১০ শতাংশ কমতে বা বাড়তে দেওয়া যেতে পারে।

“আমরা যদি ধীরে ধীরে এটা না করি তাহলে পুঁজিবাজারে লেনদেন কমে পাঁচ থেকে ১০ কোটিতে নেমে আসতে পারে। তখন পুঁজিবাজার থাকবে, কিন্তু শেয়ার লেনদেন হবে না।”

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ছানাউল হকও ফ্লোর প্রাইস এখনই তুলে দেওয়ার পক্ষপাতী নন । তিনি বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার রক্ষার জন্য ফ্লোর প্রাইস দেওয়া হয়েছে। একটা ‘সুষ্ঠু পরিবেশ’ এলে তুলে দিতে হবে।

তবে ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখার বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ। পুঁজিবাজারকে দাঁড় করাতে অভিহিত মূল্যের নিচে যেসব শেয়ারের দর চলছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে কিনে নেওয়ারও সুপারিশ এসেছে তাদের কাছ থেকে।

ছোট বিনিয়োগকারীদের সংগঠন পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, “বাই ব্যাক ছাড়া পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর কোনো সুযোগ নেই।”

ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, “তুলে দেওয়ার সাথে সাথে সবগুলো শেয়ারের দাম অনেক কমে যাবে। একটা গোষ্ঠী সেই সুযোগে সেই সমস্ত শেয়ার মানুষের কাছ থেকে কিনে নিবে।”

‘লুণ্ঠনের সুযোগ’ কমে যাওয়া একটি গোষ্ঠী ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার জন্য ‘ষড়যন্ত্র করছে’ বলেও অভিযোগ করেন এই বিনিয়োগকারী।

ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী মনে করেন, শুধু ফ্লোর প্রাইস নয়, পুঁজিবাজারের বাজে অবস্থার পেছনে আরও সেসব কারণ আছে, সেগুলো দূর না হলে অবস্থা ভাল হবে না।

‘বাজে কোম্পানির’ শেয়ারের ছড়াছড়ি, অর্থনীতিতে মন্দা পরিস্থিতি এবং আগামী বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য ‘বিশেষ কোনো প্রণোদনা না থাকাকে’ সেই কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন তিনি।

শাকিল বলেন, “পুঁজিবাজারে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকেই একটা খারাপ সময় যাচ্ছিল। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জানুয়ারির দিকেই বুঝতে পেরেছিল করোনাভাইরাসের একটি প্রভাব অর্থনীতিতে আসবে। তারা ফেব্রুয়ারি থেকে শেয়ার বিক্রি করা শুরু করে। এই শেয়ার বিক্রির চাপটা কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়েছে।

“এছাড়া ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে যে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, সবগুলোর অবস্থাই খারাপ। তারা কেউ ঠিকমত লভ্যাংশ দিতে পারছে না। ৭০ থেকে ৮০টি কোম্পানি আছে, যেগুলোর দাম ১০ টাকার নিচে। এগুলো পুঁজিবাজারের বেসিক চ্যালেঞ্জ।”

এ অবস্থায় পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, পুরনোগুলোও থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

শাকিল বলেন, “বাজেটেও পুঁজিবাজারের জন্য আশানুরূপ কিছু নেই। কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলেও আরও অনেক খাতও তা পেয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারের তুলনায় বেশি সুবিধা পেয়েছে ওইসব খাতগুলো। মানুষ পুঁজিবাজারে টাকা রাখতে চাইবে না, রাখবে ব্যাংকে।”

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে ১০ শতাংশ কর দিয়ে ‘কালো টাকা সাদা’ করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে সাথে শর্ত দিয়েছেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে সেই টাকা ৩ বছরে পুঁজিবাজার থেকে বের করা যাবে না।

পুঁজিবাজার ছাড়াও ১০ শতাংশ কর দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা, নগদজমা, ব্যাংকে জমা, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মত ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে বাজেটে, সেসব ক্ষেত্রে কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি।





অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার এর সকল খবর