Dhaka, Saturday, 15 August 2020

আত্মজীবনী: “অপরাজিত জীবন” - ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি : পর্ব-৪১

2020-07-07 19:28:40
আত্মজীবনী: “অপরাজিত জীবন” - ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি : পর্ব-৪১

সুখবর প্রতিবেদক: ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি, ব্যক্তি জীবনে একজন সফল মানুষ, সফল ব্যবসায়ী। জীবনটা শুরু হয়েছিল অনেক কষ্টে। শৈশবেই দেখেছিলেন জীবনের কঠিন রূপ। একবেলা খাবারের জন্যে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। লেখাপড়াটা হয় কী হয় না, এমন অনিশ্চয়তার মাঝেও জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। স্রোতের প্রতিকূলে বেয়ে নিয়েছেন জীবন নামের নৌকাটিকে। পরবর্তীতে দেশে-বিদেশে নামী-দামী ডিগ্রি নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক, টেকনোমিডিয়া লিঃ এর ম্যানেজিং ডিরেক্টের, রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিল লিঃ এর অডিট কমিটির চেয়ারম্যান, পে ইউনিয়ন বাংলাদেশ লিঃ এর ম্যানেজিং ডিরেক্টরসহ জড়িয়ে আছেন অনেক ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের সাথে। আত্মজীবনীতে তিনি অকপটে তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনের কঠিন সেই দিনগুলির কথা।

ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি’র আত্মজীবনী “অপরাজিত জীবন”ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সুখবরডটকম’ -এ। প্রতিদিন আপডেট হচ্ছে এক পর্ব করে।

অপরাজিত জীবন

ড. যশোদা জীবন দেব নাথ

পর্ব-৪১

আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। ঘরে বসে লকডাউনে কাটিয়ে দিলাম দুই মাসের বেশি সময়। চতুর্দিক থেকে আসতে থাকে শুধুই খারাপ খবর। মনটা যেনো ভেঙে পড়ছে। এদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে, সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার আহবান জানাতে, সারাদেশের রাজপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর নিজস্ব হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় ও উপজেলায় অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র খুলে সাধারণ মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন সেনা সদস্যরা। সেনাবাহিনীর এই মহৎ উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে যমুনা গ্রুপ। রোববার (১১ই এপ্রিল) বিকাল ৪টায় সেনা সদর দফতরে এডজুটেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. এনায়েত উল্লাহ এবং পরিচালক (মেডিক্যাল সার্ভিসেস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেনের হাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী যমুনা গ্ৰুপের নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে প্রস্তুতকৃত বারবার ব্যবহারযোগ্য ৫,০০০ পিস পিপিই, ১০,০৫৬ পিস যমুনা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও ২০,০০০ পিস ফেস মাস্ক তুলে দেন যমুনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব শামীম ইসলাম ও পরিচালক ড. মোহাম্মদ আলমগীর আলম।

এর আগে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১০ কোটি টাকা আর সরকারি হাসপাতালসমূহে বিনামূল্যে সরবরাহ করার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমানের নিকট ৮,০১৬ পিস পিপিই, ১০,০৫৬ পিস যমুনা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও ১৫,০০০ পিস ফেস মাস্ক প্রদান করেছে যমুনা গ্রুপ। দেশের এই মহাদুর্যোগে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর পাশে থাকার জন্য সেনা প্রধানের পক্ষ হতে যমুনা গ্ৰুপকে স্বাগত জানানো হয়।

সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ, নামি দামি অনেক বড় বড় ব‍্যবসায়ী গ্রুপ। ঢাকার কিছু সাধারণ মানুষের কথা কয়জনেই বা বলে। অনেকেই ফিরে আসে জাতীয় পরিচয় নাই বলে। ত্রাণ নিয়ে হাহাকার। এমন সময় আমাকে বলে শারমিন লিনা, দাদা ঢাকার কিছু গরীব মানুষ ভীষণ অসুবিধায় আছে, তাদের ঘরে খাবার নাই। মনটা কেঁদে উঠলো শুনে, পারা যাবে না অনেককে এই সাহায্য করতে, ক্ষুদ্রভাবে অঞ্চলভিত্তিক সাহায্য করা যেতে পারে। কয়েকজনের সাথে আলাপ করলাম, সবাই রাজি হয়ে গেলো। শারমিন মোহাম্মদপুর বাজারে যেয়ে ৩০০ লোকের খাদ‍্যের প‍্যাকেট করলো। এ ব‍্যাপারে আমার সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো, ছোট ভাই হাসান, শাবরিনা সাবা, কমলেশ, শ‍্যামল দা, বিদ‍্যুত দা, সুমা রায়, তাহছিন ও ধানমন্ডি থানার এসি। সবাই মিলে ত্রাণ কাজে অংশ নিলাম। দেখলাম গরীব মানুষের সত্যিকারের কষ্ট। এই কষ্ট কলম দিয়ে লেখা যায় না। হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। হায়রে করোনা, মানুষদের এনে দাঁড় করালে এক অসহায়ত্বের দারপ্রান্তে। অসহায়ত্ব কাকে বলে, শুধু তারাই বুঝতে পারে যাদের ঘরে নাই কোনো বাজার, নাই দুবেলা রান্না করার মতো চাউল, মধ্যবিত্ত পরিবার না পারছে রাস্তায় দাঁড়াতে না পারছে কারো কাছে হাত বাড়াতে, শুধুই চোখে মুখে অসহায়ত্বের ছাপ লেগে আছে। সরকারি সাহায্য তো সব জায়গায় ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছেই না। ক্ষুধার যন্ত্রণা যারা বোঝার তারা ঠিকই বুঝে। বোঝা যায় মানুষের দুঃখ‍ দুর্দশার কথা।

টেলিভিশন খুললেই মৃত্যুর সংবাদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। দেখতে দেখতে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে সুদূর আমেরিকা, ইটালি, ফ্রান্স, জার্মানিসহ পুরো এশিয়া। আর দেখতে ইচ্ছা করে না প্রতিদিন ২:৩০ মিনিটের স্বাস্থ্য বুলেটিন, শুধুই করোনা আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংবাদ, এলাকা লকডাউন, ঢাকা শহর যেন পরিণত হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে এক রেড জোনে। ঘরের মধ্যে বন্দি জীবন আর কতো সময়ই বা ভালো লাগে? এ যুগের ছেলেমেয়েরা তো ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট নিয়েই ব‍্যস্ত, ওরা হয়তো বুঝতেই পারছে না আমরা কতো বড় ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে পার করছি?

শুভদ্বীপ এর এবার "ও" লেভেল পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিলো, শুভদ্বীপ আমার ছেলে, দেবস্মীতা ও দেবপ্রীয়া আমার মেয়ে, শুভদ্বীপের ভাগ‍্যে "ও" লেভেল পরীক্ষা দেওয়া আর হলো না, এই যন্ত্রণা ওর মত সব ছাত্রদের। ওদের সম্বন্ধে আমি পরের পর্বে বিস্তারিত লিখবো। আমার কষ্টের কথা, অনুভূতির কথা শুধু শেয়ার করতাম আমার স্ত্রী সোমার সাথে, যখন অতীষ্ঠ হয়ে উঠতাম ঘরে বসে থাকতে থাকতে, মাঝে মধ‍্যে সময় কাটাতাম সিক্রেট রেসেপি'তে, আমি, কমলেশ আর শ‍্যামল দা। ওখানে মাঝে মাঝে যেতাম দুঃখ কষ্টগুলো কমলেশ এবং শ‍্যামল দা’র সাথে শেয়ার করতে।

অফিসে গেলাম, প্রকাশ বলছে ওর এক আত্মীয় গত রাতে মারা গেছে, ফরিদপুর থেকে শংকর জানালো ভানুদা আর নেই, আর সহ্য করতে পারছি না। সহ্য করতে পারছি না এই ভেবে যে আমার অনেক শুভাকাঙ্খীরা চলে যাচ্ছে এক এক করে। এ চলে যাওয়া তো অনেকেরই আপনজন, সরকারের খাতায় শুধুই উঠছে নাম্বার, আর যার আপনজন যাচ্ছে তারাই একমাত্র বুঝতে পারছে প্রিয়জন হারানোর মর্মস্পর্শী বেদনা, এ বেদনা সারা জীবনের।

এই তো সেদিন চলে গেলেন মোরশেদ আলম ভাই, আমাদের মাসুদ ভাইয়ের বড় ভাই, মাসুদ ভাই বাংলাদেশের ব‍্যাংকিং জগতের এক প্রতিকৃতি, যার আছে ছয়-সাতটি ব‍্যাংক বাংলাদেশে। কোম্পানি হবে তিন ডজনেরও বেশি। চলে গেলেন অনেক নামি দামি মানুষ যারা সমাজে রেখেছেন অনেক অবদান। করোনার মহামারি কোথায় যেয়ে থামবে, কেউ বলতে পারছে না। শুনেছিলাম জীবন কখনও হারায় না, বিলীন হয়ে যায় না কোনোদিনই। জীবন প্রবাহমান। আবহমান কাল ধরে জীবন প্রবাহিত হয় যুগ থেকে যুগান্তরে, কাল থেকে কালান্তরে, জীবন থেকে মহাজীবনে কিন্তু প্রশ্ন একটাই! আমরা কোন সমাজ ব‍্যবস্থায় কোন পৃথিবীর দিকে ধাবিত হচ্ছি? কবে আমরা ক্ষমা পাবো? কবে আবার স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরে যেতে পারবো? নাকি এভাবে শেষ হতে থাকব আমরা একে একে সবাই? সৃষ্টিকর্তার কাছে আর কত ক্ষমা চাইলে আমাদের ক্ষমা করে দিবেন? এরকম হাজারো প্রশ্ন মনে দানা বেঁধে আছে আমার! হে ঈশ্বর তুমি পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে ক্ষমা করে দাও, ক্ষমা করে দাও তোমার সৃষ্টির সেরা জীব এই মানুষকে...





ব্যক্তিত্ব ও জীবনী সর্বশেষ খবর

ব্যক্তিত্ব ও জীবনী এর সকল খবর