Dhaka, Saturday, 15 August 2020

সাফল্যের কোনো সূত্র আছে কি? কিভাবে সন্ধান পাবেন সেই সূত্রের?

2020-07-08 13:18:56
সাফল্যের কোনো সূত্র আছে কি? কিভাবে সন্ধান পাবেন সেই সূত্রের?

ডা. মেখলা সরকার: সফলতা সবার কাছেই কাঙ্ক্ষিত একটি শব্দ। কিন্তু সাফল্য বা সফল হওয়া মানেই বা কী? অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সম্মান, পরিচিতি বা কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি ইত্যাদি অর্জনই কি সাফল্য। নাকি এর মানে আরও অন্য কিছু? ধনাঢ্য আর ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি যদি দিন শেষে অসুখী বা নিজেকে নিয়ে অতৃপ্ত থাকেন, তাকে কি খুব একটা সফল বলা যায়?

আসলে সফলতা শব্দটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যেই খুব ব্যক্তিগত এবং একেকজনের কাছে একেক রকম। তবে বলা যায়, প্রতিটি মানুষই যে অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেয় সে সম্ভবনার বিকাশ, জীবনযাপনে এর প্রয়োগ এবং পরিতৃপ্তিবোধ থাকা সফল মানুষের জীবনযাপনের মাপকাঠি।

অর্থাৎ সফলতা মানে ব্যক্তির স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন। সফল মানুষ তার পেশাগত জীবন, সম্পর্ক ও জীবনযাপন নিয়ে পরিতৃপ্ত ও পরিপূর্ণতা বোধ করে এবং তার কাজ সমাজে বা অন্যদের জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

সফলতার সূত্র

সফলতার আসলেই কি কোন সূত্র আছে? হ্যাঁ, আছে।

আমাদের অনেকের ধারণা ব্যক্তির ‘মেধা’ বা ‘বুদ্ধাঙ্ক’ই (আইকিউ) সফলতার মূল শর্ত। অর্থাৎ মেধাবী ব্যক্তিমাত্রই সফলতা নামক কাঙ্ক্ষিত শব্দটির দেখা পায়। কিন্তু মেধার চেয়ে আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তির জীবন ও নিজেকে দেখার ধরন, চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা, দূরদর্শিতা, আত্মবিশ্বাস, চিন্তা–আবেগের ধরন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে মানুষের ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। মেধার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিত্বের ধরন কঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যক্তির চিন্তার ধরন, ইতিবাচক জীবনবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিজের ও কাজের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদি নানা কিছুই তাকে অনেকের মধ্যে অনন্য করে তোলে। অনন্য এই বৈশিষ্ট্যই তৈরি করে সফলতার সূত্র।

লক্ষ্য নির্ধারণ

সফলতার সহজসরল মানে হলো লক্ষ্য পূরণ হওয়া। সুতরাং জীবনে আপনি নিজেকে কীভাবে দেখতে চান অথবা অন্যরা আপনাকে কীভাবে মনে রাখবে প্রথমে সেটা বের করুন। অন্যরা আপনার কাছে কী চায় সেটার চেয়ে আপনি কী ভালোবাসেন বা আপনি কী চান অথবা কোন কাজটিতে আপনি দক্ষ, সেটাকে গুরুত্ব দিন। যে কাজটি আপনি ভালোবাসেন না বা আনন্দ পান না, যে কাজে আপনার বিশ্বাস নেই, সে কাজ দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে কিন্তু সে কাজে সফলতার দেখা পাওয়া কঠিন।

সামাজিক দক্ষতা বাড়ান

সামাজিক দক্ষতা মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ায় এবং শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সফলতার কঠিন পথটি কিছুটা সহজ হয়, যদি সামাজিক যোগাযোগ বা গ্রহণযোগ্যতা ভালো থাকে। মানুষের মাধ্যমেই আমরা নানা কাজ পাই, নানা ধরনের সুযোগ বেশির ভাগই কারও না কারও হাত ধরেই আসে। সামাজিক নেটওয়ার্ক একধরনের নিরাপত্তাবোধ দেয়, আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সমস্যা মোকাবিলায় সাহস জোগায়।

শুধু তাই না, মানুষের সান্নিধ্য আমাদের মনোজগতের নতুন নতুন জানালা খুলতে সাহায্য করে, নিজেকে বুঝতে সাহায্য করে। দিশেহারা বোধ করলে বিষয়টি অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করে।

সামাজিক দক্ষতা বাড়ানোর একমাত্র পথ হলো সামাজিক মেলামেশা। সুতরাং পুরোনো সম্পর্কগুলো আরও জোরদার করুন। সম্পর্কের ছোটখাটো অপূর্ণতা মেনে নিন। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মিশুন, সময় দিন, তাদের জানুন, নিজেকে জানান।

অন্যকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকুন

নিজের কোনো ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপানো সহজ হলেও এটা আপনার জীবনে কোনো পরিবর্তন আনবে না। জীবনে ভালোমন্দ যেকোনো ঘটনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার মনোভাব সফলতার অন্যতম প্রধান শর্ত। অর্থাৎ আপনার জীবনের অর্জন, সম্পর্কের গুণগত অবস্থা, পেশাগত অবস্থান, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা সবকিছুর ক্ষেত্রে অন্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে দায়ভার নিজের কাঁধে নিন।

আপনার জীবনের দায়ভার অন্যের ওপর চাপানো মানে আপনার জীবনের ভালোমন্দের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে দিয়ে দেওয়া। আপনার জীবনে পরিবর্তন আনতে পারেন শুধু ‘আপনি’। সুতারাং কোনো কিছুর পরিবর্তন চাইলে প্রথমে আপনাকে পরিবর্তন করুন। পরিবর্তন করুন আপনার চিন্তা, আপনার আচরণ, আপনার কৌশল, আপনার মনোভাব, আপনার কাজের ধরন, আপনার ব্যবহার। আর এসব আপনার নিয়ন্ত্রণেই আছে।

তবে বিষয়টা এত সহজ নয়, নিজের ওপর দায়িত্ব নেওয়া এত সহজ নয়। এর মানে নিজের বহু দিনের অভ্যাস পরিবর্তন করার সাহস। সুতরাং প্রয়োজনে বর্তমান চাকরি ছেড়ে নতুন ভালো কিছু খুঁজুন। সম্পর্কে জটিলতা নিয়ে অস্বস্তি ঝেড়ে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলুন। ইনটিউশন বা গাট ফিলিংকে বিশ্বাস করুন। অন্যের সাহায্য চান। অন্যকে সাহায্য করুন। বন্ধুদের চাপে ‘না’ বলতে শিখুন। শরীরের যত্নে হাটা শুরু করুন, পড়ালেখায় সময় দিন ইত্যাদি।

মানসিক প্রস্তুতি

মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়, যা আমাদের যেকোনো বিষয় সহজভাবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে বা অতিরিক্ত মুষড়ে পড়া থেকে বাধা দেয়। যেকোনো চ্যালেঞ্জের ভালোমন্দ নানা রকম ফলাফল যে হতে পারে সে মানসিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। শুধু তাই না, সফলতার চূড়ায় থাকা মানেই কিন্তু স্থায়ী অবস্থান না। অনুকূল অবস্থা যেকোনো সময়ে প্রতিকূল হতে পারে সেটা মনে রাখা জরুরি।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময় ভালো খারাপ যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালোমন্দ যেকোনো কিছুই সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা আমদের সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।

মাঝেমধ্যে থামুন, সতর্কীকরণ সংকেতকে গুরুত্ব দিন

সাফল্যের পদযাত্রায় নানা কিছুর হাতছানির ফাঁদ আপনার জীবনে আসবে। এসব ফাঁদ অনেক সময় আপনাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে। যেমন, আপনি হয়তো দক্ষ চিকিৎসক হতে চান কিন্তু চলার পথে অর্থের হাতছানি আপনার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে। সুতরাং অর্থের এ হাতছানি কতটুকু আপনি গ্রহণ করবেন, সেটা আপনাকে বের করতে হবে।

মনে রাখবেন জীবন নানাভাবেই আপনাকে আপনার কাজের ফিডব্যাক দেবে। সুতরাং ব্যস্ততার মাঝে মাঝে থামুন এবং চারপাশে মনোযোগ দিন। ব্যবসার অবনতি, গ্রেড কমে যাওয়া, সম্পর্কের অবনতি, শরীর–মন খারাপ লাগা, কাজকর্মে জট পাকিয়ে যাওয়া সবকিছুই জীবনের একরকম ‘সতর্কীকরণ সংকেত’ যা আপনাকে এসব বিষয়ে আরও মনোযোগী হতে বলে।

ব্যর্থতাকে সহজে গ্রহণ করুন, লেগে থাকুন

আপনার জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে যাওয়ার পথ সব সময় আপনার অনুকূলে থাকবে না। মাঝে মাঝে আপনি হোঁচট খাবেন অথবা পড়ে যাবেন বা ব্যর্থ হবেন। কোনো বিষয়ে সফলতার স্বাদ পেতে হলে শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও লেগে থাকুন। এই লেগে থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছোট-বড় নানা রকম ব্যর্থতা, মানুষের ভুলত্রুটি, নিরুৎসাহ ইত্যাদি নানা কিছু। এসব বাধাকে স্বাভাবিকভাবে ধরে নিয়ে যে যত ক্রমাগত নিজের কাজ করে যাবে, কঙ্ক্ষিত ফলাফলের দিকে সে তত দ্রুত এগিয়ে যাবে। ব্যর্থতা নিয়ে মুষড়ে পড়ে থাকা বা এ নিয়ে মন ছোট করে থাকা মানে আপনার সাফল্যের পথে অযথা সময়ক্ষেপণ করা। উপেক্ষা শব্দটি সহজ হলেও এটা জীবনে প্রয়োগ করা অনেক সময় কঠিন। লক্ষ্যের প্রতি অবিচল আস্থা, ভালোবাসা, বিশ্বাস এসব উপেক্ষা করতে শেখায়।

শেষ কথা

লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে যে সফলতার কথা বলা হচ্ছে, সেটা জীবনখেলার একটা অংশমাত্র। এ খেলায় সব সময় আপনার পায়ে বল থাকবে বা আপনি সামনে যেতে থাকবেন, তা না–ও হতে পারে। খেলায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে যেমন মাঝে মাঝে ব্যাকফুটে যেতে হয়, মাঝে মাঝে অন্যের পায়ে বল দিয়ে দিতে হয়, এখানেও তাই। সুতরাং অভীষ্ট লক্ষ্যে যেতে মাঝে মাঝে প্রয়োজনে ব্যাকফুটে যান। অন্যকে সুযোগ করে দিন। প্রয়োজনে সাময়িকভাবে বিরতি নিন। পর্যবেক্ষণ করুন, স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল পরিবর্তন করুন।

জীবনের পথে চলা কিন্তু ১০০ মিটার রেস না, যেখানে নির্দিষ্ট দূরত্বে যেতে অনেকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় প্রথম দ্বিতীয় হতে হয়। এটা একটা ম্যারাথন দৌড়ের মতো, যেখানে আপনি কত দূর পৌঁছাতে পারলেন, কতক্ষণ টিকে থাকলেন সেটা মুখ্য। এই লম্বা রেসে মাঝে মাঝে আপনি সহযাত্রীর কাছ থেকে পিছিয়ে যাবেন, কখনো সমানতালে চলবেন, আবার কখনো সামনে এগোবেন। এখানে আপনি কার থেকে আগে বা পিছে গেলেন, সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ না বরং এই লম্বা পথে আপনি কত দূর টিকে থাকতে পারলেন সেটাই আসল। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার মনোবল, আপনার ইচ্ছাশক্তি, চলার পথে সাময়িক ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা, সবকিছুই আপনাকে একসময় সামনে নিয়ে যাবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, সাফল্য কিন্তু সুখ বা আনন্দের চাবিকাঠি নয়, তবে সুখ বা আনন্দ সাফল্যের অন্যতম উপাদান। সুতরাং যে কাজ আপনি ভালোবাসেন সেটাতে লেগে থাকুন। সাফল্য আপনার ভালোবাসার পথ ধরে আসবেই।





উন্নয়ন ও সাফল্য সর্বশেষ খবর

উন্নয়ন ও সাফল্য এর সকল খবর