Dhaka, Saturday, 15 August 2020

আত্মজীবনী: “অপরাজিত জীবন” - ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি : পর্ব-৪২ [সমাপ্ত পর্ব]  

2020-07-08 21:14:49
আত্মজীবনী: “অপরাজিত জীবন” - ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি : পর্ব-৪২ [সমাপ্ত পর্ব]
 

সুখবর প্রতিবেদক: ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি, ব্যক্তি জীবনে একজন সফল মানুষ, সফল ব্যবসায়ী। জীবনটা শুরু হয়েছিল অনেক কষ্টে। শৈশবেই দেখেছিলেন জীবনের কঠিন রূপ। একবেলা খাবারের জন্যে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। লেখাপড়াটা হয় কী হয় না, এমন অনিশ্চয়তার মাঝেও জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। স্রোতের প্রতিকূলে বেয়ে নিয়েছেন জীবন নামের নৌকাটিকে। পরবর্তীতে দেশে-বিদেশে নামী-দামী ডিগ্রি নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক, টেকনোমিডিয়া লিঃ এর ম্যানেজিং ডিরেক্টের, রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিল লিঃ এর অডিট কমিটির চেয়ারম্যান, পে ইউনিয়ন বাংলাদেশ লিঃ এর ম্যানেজিং ডিরেক্টরসহ জড়িয়ে আছেন অনেক ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের সাথে। আত্মজীবনীতে তিনি অকপটে তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনের কঠিন সেই দিনগুলির কথা।

ড. যশোদা জীবন দেব নাথ, সিআইপি’র আত্মজীবনী “অপরাজিত জীবন”ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সুখবরডটকম’ -এ। প্রতিদিন আপডেট হচ্ছে এক পর্ব করে।

অপরাজিত জীবন

ড. যশোদা জীবন দেব নাথ

পর্ব-৪২ [সমাপ্ত পর্ব]

হে সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করে দাও আমাদের, বাঁচিয়ে দাও আমাদের এই সভ‍্যতাকে। শূন‍্য থেকে যার উৎপত্তি শূন‍্যে বিলীন হবার গল্প- "জীবনের গল্প" সেটা হবার কথা নয়, শূন‍্যকে মুঠো ভরে পূর্ণ করবার যে প্রয়াস সেটাই আমার জীবনের গল্প। আর এই গল্পে জড়িয়ে আছে আমার ছোট্ট একটি পরিবার, আমার এই পরিবারের গৃহকর্ত্রী সোমা, আমার অর্ধাঙ্গিনী যার সহযোগিতা ছাড়া আমি মানুষটা পূর্ণতা পায় না। ঘরে সোমার কথাই শেষ কথা, ব‍্যস্ত থাকে সব সময় সংসার নিয়ে, কখনও রান্না ঘরে আবার কখনও বা ছেলে-মেয়েদের সাথে, ছেলে-মেয়ে বলতে শুভদ্বীপ, দেবস্মীতা, দেবপ্রীয়া।

শুভদ্বীপের এবার "ও" লেবেল পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিলো স্কলাসটিকা স্কুল থেকে। বৈশ্বিক মহামারীর কারণেই স্কুল কর্তৃপক্ষ গ্লোবাল সিদ্ধান্তে পরীক্ষা ছাড়াই প্রমোশন দিয়ে দিয়েছে "এ" লেভেলে। এই মহামারী COVID-19 স্মৃতি বহন করবে যাদের এই বছরে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিলো আবার যারা পরীক্ষা ছাড়াই উত্তীর্ণ হয়েছে। এই রকম পরীক্ষা ছাড়া পাশের রেকর্ড আছে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে।

দেবস্মীতা ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে পড়ে সপ্তম শ্রেণীতে, ওর-ও ফাইনাল পরীক্ষা জুনে হওয়ার কথা ছিল, সবই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

দেবপ্রীয়ার বয়স দুই বছর তিন মাস অতিক্রম হতে চলছে, সোমার দিনের অর্ধেকটা ওর পিছনেই কাটাতে হচ্ছে। ওর কথা বলে শেষ করা যাবে না। দুষ্টুমির যেন শেষ নাই। ইতিমধ্যে চায়ের কাপ ভেঙ্গে ফেলেছে কয়েক ডজন। বাসার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি যেন লেগেই থাকে।

আর আমার মা তো গ্রামেই থাকে। দিনে দুই-একবার কথা হয়, লকডাউনের কারণে সে আর আসতেও চায় না ঢাকায়। বাড়িতেই সে থাকতে পছন্দ করে। আর ভালোলাগার অনুভূতি ঐ গ্রামের বাড়িকে কেন্দ্র করে।

এই ছোট্ট সংসার জীবনে কতোই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় ফেলে দিয়েছে এই COVID-19। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দিনে দিনে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ধাবিত হচ্ছে, প্রতিটা দেশ এবং সে দেশের মানুষগুলো। দেশের প্রতিদিনের সিংহভাগ লেনদেনের সাথে আমি ব্যবসায়িকভাবে জড়িত, আর এই জড়িত থাকার কারণেই অফিসে যাওয়াও হয়ে উঠে বাধ্যতামূলক। জানি না কতোদিনই বা এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবো। আজও অফিসে গিয়ে খুব ভারাক্রান্ত মনে বাসায় ফিরে এসেছি কারণ আমার খুব কাছের কিছু মানুষ মারা গেছে। আপনজনের মৃত্যুর মিছিলে কেবা কবে ভালো থাকতে পেরেছে। কেন জানি এখন আর কোনো কিছুতেই ভালো থাকা হচ্ছে! কতো দিন আমার শুভাকাঙ্খীদের দেখি না- মনটা একপ্রকার বিষিয়ে উঠছে! তাইতো বারবার মনে পড়ছে আমার "শঙ্খচিল" কবিতাটি-

"আমাদের দেখা হোক মহামারী শেষে,

আমাদের দেখা হোক জিতে ফিরে এসে।

আমাদের দেখা হোক জীবাণু ঘুমালে,

আমাদের দেখা হোক সবুজ সকালে।

আমাদের দেখা হোক কান্নার ওপারে,

আমাদের দেখা হোক সুখের শহরে।

আমাদের দেখা হোক হাতের তালুতে,

আমাদের দেখা হোক ভোরের আলোতে।

আমাদের দেখা হোক বিজ্ঞান জিতলে,

আমাদের দেখা হোক মৃত্যু হেরে গেলে।

আমাদের দেখা হোক আগের মত করে।

আমাদের দেখা হোক সুস্থ শহরে..."

জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা কঠিন কাজ। গল্প-উপন্যাসের চেয়েও আরও কঠিন। গল্পে অথবা উপন্যাসে লেখক ইচ্ছা করলে যখন-তখন কোনো চরিত্রকে মেরে ফেলতে পারেন। আর তারা করেনও তাই। আপনি খুবই আগ্রহ নিয়ে একটি উপন্যাস পড়বেন অথবা নাটক দেখবেন। কিন্তু লেখকের হাতে যার জন্ম ও মৃত্যু তাকে আর কতক্ষণ আপনি পাবেন! কিন্তু বাস্তব হলো দুরূহ। মানুষের জীবন বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত। কোনো অধ্যায় হয় সুখকর আবার কোনো কোনো অধ্যায় হতে পারে অসহনীয় নিরবধি দুঃখে রচিত। রচিত বলার কারণ, নিয়তিতে আমাদের হাত নেই (হয়তো বা আছে আমি নিশ্চিত নই)। কোনো অধ্যায় আবার এই দুই সুখ-দুঃখের অনুভূতির সংমিশ্রণে অনেক সময় ঘোলাটে হয়ে যেতে পারে।

একজন মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো অন্যদের জন্য আনন্দ অথবা দুঃখের বয়ে নিয়ে আসে। অন্যের দুঃখে আমরা দুঃখিত হই আবার অন্যের আনন্দে আমরা আনন্দিতও হই। মানুষ নামক প্রাণীই অন্যের সুখ-দুঃখ ভাগ বণ্টন করতে পারে। আর কোনো প্রাণী করতে পারে না। অনেক সময় জীবনের ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলো চোখের সামনে বাস্তবের মতো ভেসে ওঠে আমার। আমি শিহরিত হই অন্যজনের অভিজ্ঞতা শুনে।

আবার কখনো আমার এ রকম মনে হয় যে, আমি যত তাড়াতাড়ি গল্প বলা শেষ করবো ততই ভালো; যেন হাফ ছেড়ে বাঁচি আমি। জীবনের গল্পগুলো যেমন হয় রোমাঞ্চকর, তেমনি হয় রোমহর্ষক।

আমার নিজেকে অনেক ক্লান্ত মনে হয়। মনে হয় জীবনের কাছে বিধ্বস্ত এক পরাজিত সৈনিক। নিজেকে নিজে মিথ্যে আশ্বাস দেই, “একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ কোনো একদিন একটা ম্যাজিক হবে।”

কখনো কখনো মনে হয়, যা কিছুকে আমি সুখ ভাবতাম তার সবকিছু ওই সময়টায় দাঁড়িয়ে আছে যেই সময়টায় আমি আর কখনো ফিরে যেতে পারবো না। অনেকদিন প্রিয় শহরটাকে দেখি না। অনেকদিন হয়ে গেছে গ্রামের বাড়ি যাই না, অনেকদিন মায়ের হাতে ভাত খেতে পারি না। বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে পারি না। ইদানিং সময়টা অনেক অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। আমার মতো হয়তো অনেকেই যারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেদের প্রিয় শহর আর প্রিয় মানুষদের ছেড়ে অনেক দূরে থাকে বৈশ্বিক মহামারীর কারণে। কখনও কখনও মধ্যরাতে যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আমার মনে হয় কেউ একজন আলোটা জ্বালিয়ে দিক। ঘুমন্ত শহরটা আরেকবার জেগে উঠুক আমার মতো করে। এই ছোট্ট জীবনে নিজের কষ্টের বোঝাগুলো আমি আর বইতে পারছি না। দুঃখ, শোক সব নাকি সময়ের সাথে সাথে মিলিয়ে যায়। সময় নাকি সব ক্ষত পূরণ করে দেয়।

এক জীবনের গল্পগুলো হয় কখনো হরর মুভির মতো লোমহর্ষক আবার কখনো হয় রোমাঞ্চকর। কখনো সুখকর আবার কখনো ভয়ংকর। প্রতিটি মুহূর্ত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। অনেকটা বৃষ্টির ফোটার মতো। এখন আপনি যদি বৃষ্টিতে এক মাইল হাঁটেন তো কতটা ফোটা বৃষ্টি পড়বে আমাদের গায়ে চিন্তা করুন। জীবনের গল্পগুলো জমাট বাঁধা রক্তের মতো। জটিল এক সমীকরণের মাধ্যমে রক্ত যেমন জমাট বাঁধে, অভিজ্ঞতাগুলো তেমনি মস্তিষ্ক নামক জায়গায় জমাকৃত হতে থাকে জটিল এক সমীকরণে। এক জীবনে মানুষ কত স্বপ্ন দেখে! কখনো ভাবিনি এভাবে থমকে যাবে জীবন! জীবনের আঁকাবাঁকা পথে হাজার গোলকধাঁধায় নিজেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দিয়েছে প্রতিনিয়ত।

জীবনে চলার পথে বাস্তবতা বারবার আমাকে পরাজিত করতে চেয়েছে কিন্তু হার মানিনি কখনো। বিশ্বাস আর শক্ত মনোবল নিয়ে বারবার সামনের দিকে আমি পথ হেঁটেছি, ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করবে এই বিশ্বাস নিয়ে। পরাজয় মেনে নিয়ে কতবার শূন্যের কোঠায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি আমি, আজও অসহায়ের মতো আমি শূন্যতাকে বোধ করি। পৃথিবীতো শূন্যের মতোই গোলাকার, গোলাকার এই পৃথিবীকে প্রকৃতির সাথে পূর্ণতায় ভরে দিয়েছে মানুষ, মানুষের সভ্যতা, পৃথিবীটা এক বিচিত্র গ্রহ। এখানে মানব সন্তানদের চেহারা হয় ভিন্ন রঙের। মানব সন্তানেরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। কেন সবাইকে বিধাতা এক ভাষা অথবা একই রং দিয়ে সৃষ্টি করলেন না! চিন্তার বিষয়!

ঈশ্বরের সৃষ্টির অপার লীলাভূমিতে আমরা সবাই আজ অসহায়, অসহায়ত্ব বরণ করে নিয়েই আমি সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, প্রবাহমান জীবনে চলার পথে যদি কাউকে কখনো কষ্ট দিয়ে থাকি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন! এই ভেবে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন যে- মানুষ হিসেবে আমি খুবই ক্ষুদ্র মানুষ এবং জ্ঞান বুদ্ধি শিক্ষা-দীক্ষায় এতটাই নগণ্য যে সাধারণ মানুষের থেকেও মূল্যবোধের জায়গাটাতে খুব অসহায় বোধ করি মাঝে মাঝে। সেই ছাত্রজীবন থেকে দারিদ্রতার কষাঘাতে জীবনের প্রতি পদে পদে এতটাই দেখেছি যে, সবাই জ্ঞানরাজ্যের রাজা হয়ে বসে আছে, যেখানে মানুষের মূল্যবোধ ধুঁকে ধুঁকে দুমড়ে-মুচড়ে কাঁদে। সেই সমস্ত জ্ঞান রাজ্য মানুষের কাছে আমি নিতান্তই ছাত্র মাত্র। জীবনের প্রতি পদে পদেই যেন ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি, আমার জীবনের এতটা পথ অতিক্রম করেছি আমি, তারপরও আজও বুঝলাম না জীবনের মানে কী? কতকিছুই জীবনে জানতে চেয়েছিলাম, বুঝতে চেয়েছিলাম, জ্ঞানী রাজ্যের ঐ মানুষদের মত যা আজও আমার জানা হলো না!

আফসোস জীবনে কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিছুই শিখতে পারলাম না, নেহায়েৎ এক হতভাগা ছাড়া আমি আর কিছুই নই! তাই আমার এই কাঁচা হাতের লেখায় যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, কোনো ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, কারণ নিজেকে প্রমাণ করতে নয়, নিজের অজ্ঞতাকে বারবার দেখতে চেয়েছি, জানতে চেয়েছি, শিখতে চেয়েছি আমি আপনাদের কাছ থেকে।

আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আপনাদের, কারণ আপনাদের উৎসাহ উদ্দীপনায় অজ্ঞ, জ্ঞানহীন এই আমি মানুষটা নির্বোধের মত দিনের পর দিন চেষ্টা করেছি কিছু লিখার, জানি সেটা লিখতে পারিনি, তার পরেও ক্ষমা করে দিবেন আমাকে...

ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুন, ভালো থাকুক এই পৃথিবী, ভালো থাকুক পৃথিবীর মানুষ!





ব্যক্তিত্ব ও জীবনী সর্বশেষ খবর

ব্যক্তিত্ব ও জীবনী এর সকল খবর