Dhaka, Tuesday, 24 November 2020

আবার বাতি জ্বলেছে নাটকের মঞ্চে

2020-11-15 09:42:06
আবার বাতি জ্বলেছে নাটকের মঞ্চে

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক, সুখবর ডটকম: করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে আবার বাতি জ্বলেছে নাটকের মঞ্চে, ছোট বড় দলগুলো নিয়মিত মহড়ার পাশাপাশি প্রদর্শনীতে ফিরছে, এখন তাদের বড় সঙ্কটে হয়ে উঠেছে টাকা।

প্রায় ছয় মাস পর সীমিত পরিসরে আবার প্রদর্শনী শুরু হলেও অর্ধেক আসনে দর্শক বসিয়ে খরচ তোলাই দায় হয়ে পড়েছে। মহামারীর অর্থনৈতিক অভিঘাতে শিল্পীরাও অনেকে তাদের পেশাজীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, ফলে দল গড়ে তুলতে হচ্ছে নতুন করে।

বাংলাদেশে মঞ্চনাটকের চর্চা এখনও ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত একটি বিষয়। সেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় অনটন নিয়েই দলগুলোকে চলতে হয়।

এখন হল ভাড়া মওকুফ করায় নবযাত্রা কিছুটা সহজ হলেও দীর্ঘ বিরতিতে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে দলগুলোর সময় লাগবে বলেই নাট্যকর্মীরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ আক্ষেপ করে বললেন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ‘আস্ফালনের অপসংস্কৃতির’ পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে ঠিকই, কিন্তু দেশীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তারা সহযোগিতা করতে চায় না।

“কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও সাহায্য দিতে বেশ আগ্রহী, অথচ সাংস্কৃতিক চর্চায় এদের সহযোগিতা নেই। এদেশে বয়স্ক ভাতা রয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীরা একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর সরকার থেকে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্য পায়, কিন্তু একজন প্রবীণ শিল্পী, জীবনের অনেকটা সময় শিল্পচর্চার সাথে জড়িত থাকা মানুষগুলো হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়।”

তবে মহামারীর বিরতির পর নাটকের প্রদর্শনীর জন্য মহিলা সমিতির বিশেষ অনুদান এবং মহিলা সমিতি ও শিল্পকলা একাডেমির হলরুমগুলোর ভাড়া মওকুফ করে দেওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ঢাকা থিয়েটারের প্রধান কামাল বায়েজীদ।

তিনি বলেন, অক্টোবর থেকে আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছয় মাস নাটকের হলভাড়া মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। মহামারীর সময়টায় অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন থেকে ৮ হাজার শিল্পীকে ৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে, ফেডারেশনের নিজস্ব ফান্ড থেকে প্রায় ৮ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

“আমরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব করেছি, নাটকের বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য যাতে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ অনুদান হিসেবে দেয়া হয়। মাননীয় মন্ত্রী এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।”

মহামারীর দিনে নাট্যচর্চা

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকলে মার্চ মাঝামাঝি সময়ে অন্যসব বিনোদন কেন্দ্রের মত সারা দেশের সব থিয়েটার ও সিনেমা হলও সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।

সরকার বিধিনিষেধ শিথিল করার পর আগস্টে বিনোদনকেন্দ্রগুলো খুলতে শুরু করে। ২৮ আগস্ট বেইলি রোডে মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে মান্নান হীরার লেখা ও সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় শূন্যন রেপার্টরি থিয়েটারের নাটক ‘লালজমিন’।

অক্টোবরের শেষে শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চগুলোও পরীক্ষামূলকভাবে নাটকের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

কামাল বায়েজীদ জানান, মহামারীর সময়ও নাট্যদলগুলো অনলাইনে তাদের চর্চা চালু রেখেছিল। ঢাকা থিয়েটার, অনুস্বর, পদাতিক, অনুরাগ থিয়েটারসহ বিভিন্ন দল এখন নতুন নাটক নিয়ে মঞ্চে আসছে।

সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এখন প্রদর্শনী হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “নাটক আবার শুরু হওয়ার সাথে সাথে দর্শকদেরও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।”

নাট্যদল আরণ্যক গত ৩০ অক্টোবর শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে ফিরেছে তাদের বহুল প্রশংসিত নাটক ‘রাঢ়াঙ’ নিয়ে।

সাত মাস পর খুলছে শিল্পকলার মঞ্চ

এ দলের প্রাধান মামুনুর রশিদ বলেন, “করোনাকালে যেখানে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ, সেখানে নাটকের কাজ করা মুশকিল। তারপরেও নাট্যচর্চার সাথে সম্পৃক্তরা এই দীর্ঘ বিরতিতে অনলাইনে কাজ করেছেন। নানান ধরনের আলোচনা, পর্যালোচনা এমনকি মহড়াও চলেছে অনলাইনে।”

তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমির মহড়া কক্ষগুলো এখন খুলে দেওয়া হয়েছে এবং সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার নাটকের প্রদর্শনী চলছে। ছয় মাসের জন্য হলের ভাড়া মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে এবং নাট্য শিল্পীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার বিষয়টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। সেই ব্যবস্থা হয়ে গেলে সংকট মোকাবিলা করা অনেকটা সহজ হবে।

২৮ নভেম্বর নাগাদ ‘কহে ফেসবুক’ নামে একটি নতুন নাটকের মঞ্চায়ন হবে বলে জানান মামুনুর রশিদ।

তিনি বলেন, “দর্শকের উপস্থিতি এমনিতেই কম। এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে নব্বই জন এবং জাতীয় নাট্যশালায় দেড়শ জনের স্থান সংকুলান হচ্ছে।”

বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহীম মিলনায়তনে ১৮ সেপ্টেম্বর মঞ্চস্থ হয় প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের নাটক ‘আওরঙ্গজেব’।

এ দলের প্রধান অনন্ত হীরা বলেন, “প্রায় আট মাস হতে চললো আমরা একটা ভয়াবহ সময় কাটাচ্ছি। এ সময়ে নাটক এবং নাটকের চর্চা থেকে নাট্যশিল্পীরা দূরে ছিলেন। এর ফলে একটা বড় রকমের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

“তাছাড়া মহামারীর কারণে অনেক নাট্যকর্মীই নিজেদের চাকরি হারিয়েছেন, অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন, তারা এখন নিজেদের অর্থনৈতিক ধকল সামলাতে ব্যস্ত। প্রত্যেকটি দলকে আবার নতুন করে সংগঠিত হতে হচ্ছে।”

অনন্ত হীরা বলেন, মঞ্চ নাটকে এমনিতেও দর্শক উপচে পড়ার মতো অবস্থা সচরাচর হয় না। তারওপর দীর্ঘ বিরতিতে দর্শকদেরও ‘এক ধরনের অনভ্যস্ততা’ তৈরি হয়েছে।

এই অবস্থার মধ্যেও প্রদর্শনীতে দর্শক উপস্থিতি ‘সন্তোষজনক’ ছিল জানিয়ে এই নাট্যকার বলেন, “অর্ধেক সিটের কম দর্শক রাখার বাধ্যবাধকতার কারণে আমাদের প্রডাকশন খরচ পুরোপুরি ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নাটকের দলগুলোর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যাবে বলে আমার ধারণা”

অনন্ত হীরার পর্যবেক্ষণ বলছে, গত দুই মাসে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ দল পুরোপুরি সংগঠিত হয়ে মঞ্চে ফিরতে পেরেছে।

এক প্রশ্নের উত্তরে অনন্ত হীরা বলেন, ঢাকায় মঞ্চনাটকের প্রতি প্রদর্শনীতে ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। মঞ্চের ভাড়া ছাড়াও বিনোদন, লাইটিং, প্রপ্স, বিজ্ঞাপন, মেইকআপ, প্রচারের বিষয়গুলো এর অন্তর্ভুক্ত।

"টিকেট বিক্রি থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি নাটকের মেরিটের উপর নির্ভর করে। নাটকটি কোন দল থেকে করা হচ্ছে, দর্শকের উপস্থিতি কেমন এসব বিষয় আছে। শুধু টিকেট বিক্রি করে প্রোডাকশন খরচ পুরোপুরি কখনোই ওঠানো যায় না। বেশিরভাগ সময় নাট্যদলগুলোর লোকসানেই নাটক মঞ্চস্থ করে, এটাই সত্যি"।

আওরঙ্গজেব নাটকটির খরচের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এর প্রতি শোতে খরচ ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। মহমারীর মধ্যে আবার নাটক শুরুর পর মোট তিনটি শো হয়েছে। এর মধ্যে মহিলা সমিতির দুটি শোতে গড়ে ১৩ হাজার টাকার টিকেট বিক্রি হয়েছে।

“মহামারিতে টিকেটের মূল্য আগের মতই আছে। আগেও প্রতি শোর টিকেটের মূল্য ১০০, ২০০ এবং ৩০০ টাকা ছিল, এখনও তাই। তবে দর্শকের ভিড় বেশি হলে টিকেটের মূল্য ৫০০ টাকাও হয়।”

অর্থসঙ্কট নিত্যসঙ্গী

নাট্যকর্মীরা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে হলেও নাট্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন, মহামারীর ধাক্কা সামলেও তারা ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কামাল বায়েজীদের দৃষ্টিতে এ শিল্পের আসল সঙ্কট অন্যখানে।

তিনি বলেন, ভারতবর্ষের অন্য জায়গায় নাটকের সাথে সম্পৃক্ত সবার ন্যূনতম একটি মাসিক সম্মানী থাকে। নাট্যদলগুলোকে নতুন প্রযোজনার জন্যও আলাদা টাকা দেওয়া হয়, মঞ্চ তৈরির জন্য অনুদান দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সেসব কিছু তৈরি হয়নি।

“সংস্কৃতি খাতে এ বছর বাজেট ৫২৬ কোটি টাকা। তার মানে রাষ্ট্র যদি ১০০ টাকা বাজেট ধরে, সেখানে সংস্কৃতির বরাদ্দ হয় ১১ পয়সা। এর মধ্যে সাত পয়সা চলে যায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ জাতীয় জাদুঘর, বাংলা একাডেমি ইত্যাদি খাতে।

“মূল কর্মীদের জন্য অনুদান বা সাহায্যের পরিমাণ এতটাই অপ্রতুল, তা দিয়ে আর থিয়েটার বা অন্যান্য কাজগুলো করা যায় না। এ কাজগুলো নিজেদের টাকায় করতে হয়।”

দর্শকও ফেরাতে হবে

আগে যারা নিয়মিত মঞ্চ নাটক দেখতেন, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এখন তাদের অনেকেই যাওয়ার সাহস করতে পারছেন না।

থিয়েটারগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকঠাক অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তাদের অনেকের উদ্বেগ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগে প্রাক্তন শিক্ষার্থী অভিনয়শিল্পী সাফওয়ান মাহমুদ বলেন, “মঞ্চনাটক ফিরে এসেছে বটে, কিন্তু দর্শকদের বেশিরভাগই সে ব্যাপারে অবগত নন। এছাড়া অনেকে জনসমাগমে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ইতস্ততবোধ করছেন।”

তার মতে, দর্শকদের মঞ্চে ফিরিয়ে আনার জন্য আশ্বস্ত করতে হবে, সেজন্য স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মানার পাশাপাশি অনলাইনে প্রচার বাড়াতে হবে।

“সামনে শীত আসছে, করোনাভাইরাস বিস্তারের দ্বিতীয় ধাপ নিয়েও দর্শকরা চিন্তিত। তাদের আশ্বস্ত করতে না পারলে মঞ্চে আনা যাবে না।”

সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।





সংস্কৃতি ও বিনোদন সর্বশেষ খবর

সংস্কৃতি ও বিনোদন এর সকল খবর