Dhaka, Sunday, 17 January 2021

মুজিবর্ষে সংসদে বিশেষ অধিবেশন: সর্বদলীয়ভাবে জাতির পিতাকে বিনম্র শ্রদ্ধা

2020-11-23 17:00:43
মুজিবর্ষে সংসদে বিশেষ অধিবেশন: সর্বদলীয়ভাবে জাতির পিতাকে বিনম্র শ্রদ্ধা

তাপস হালদার

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ চব্বিশ বছরের লড়াই সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আমরা পেয়েছি একটি লাল-সবুজের পতাকা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ থেকে শতবছর আগে তিনি এই ভূখন্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই বাঙ্গালীরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন এই মহামানব। এ বছরটি তাঁর জন্মশতবার্ষিকী। বাঙ্গালী জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় নানা আয়োজন পালন করছে।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণ করে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল গত ২২-২৩ মার্চ। করোনা মহামারীর কারণে সে সময় অধিবেশনটি হতে পারেনি। সেই অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের অকৃতিম বন্ধু সদ্য প্রয়াত শ্রী প্রণব মুখার্জি ও নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারীসহ বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। এর আগে অবশ্য দুইবার সংসদের বিশেষ বৈঠক হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ৩১শে জানুয়ারী। যুগোস্লোভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো এবং ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বরাহগিরি ভেংকট গিরি সে বৈঠকে ভাষণ দিয়েছিলেন। সংসদের বিশেষ অধিবেশন এটাই প্রথম। উচ্চ আদালতের নির্দেশে সম্প্রতি সংসদ কক্ষে জাতির জনকের প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে। তারপর এটাই জাতির জনকের ছবিসহ সংসদের প্রথম অধিবেশন।

অধিবেশনটি শুরু হয় গত ৯ নভেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে। পাঁচ কর্মদিবসব্যাপী অধিবেশনে জাতির পিতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, কর্ম, আদর্শ, দর্শন, নীতি-নৈতিকতা, অসাম্প্রদায়িক ভাবনা ও দেশপ্রেমের ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটা শোনানো হয়।

তারপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সংসদ কার্যবিধির ১৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংসদে সব দলের ৭৯ জন সংসদ সদস্যদের ১৯ ঘন্টা ৩ মিনিট আলোচনার মধ্য দিয়ে ১৫ নভেম্বর জাতির পিতাকে সর্বসম্মতভাবে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রস্তাবটি কন্ঠভোটে পাশ হয়।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ তাঁর স্মারক বক্তৃতায় বলেন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে জানতে হলে বাঙ্গালীর মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। এই দুই সত্তাকে যারা আলাদাভাবে দেখার চেষ্টা করেছে, তারা ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্তরালের বঙ্গবন্ধু শক্তিশালী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙ্গালী থাকবে, এদেশের জনগণ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধু সবার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

প্রস্তাবটি উত্থাপনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন দেশ, লাল-সবুজ পতাকা ও সংবিধান উপহার দিয়েছেন, বিশ্ব সভায় বাঙ্গালীকে আত্মপরিচয় দিয়ে গর্বিত জাতি রূপে মাথা উঁচু করে চলার ক্ষেত্র রচনা করেছেন। এক সময় বঙ্গবন্ধুর নাম এবং ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়। ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট জাতির পিতার নির্মম হত্যাকান্ডের পর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সে ঐতিহাসিক ভাষণ এখন বিশ্ব প্রামাণ্য হেরিটেজ। তিনি বলেন, ইতিহাস মুছে ফেলা সহজ নয়, ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়। এখন থেকে আর কেউ ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছতে পারবে না, এটাই বাস্তবতা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা আজ আমাদের মাঝে নেই। তাঁর আদর্শ, তাঁর প্রতিটা কথা, বাক্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। দুঃখ, দুর্দশা দূর করে দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে জাতির পিতার আজন্ম স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ৬দফা বঙ্গবন্ধুকে একক নেতায় পরিণত করেছিল। তিনি কেবল একটি দলের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের নেতা, মানুষের নেতা। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নেতা নন, তিনি জাতির জনক।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, বঙ্গবন্ধু একটি পতাকা, একটি আন্দোলন, একটি বিপ্লব, একটি ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু একজন রাজনীতির কবি এবং ইতিহাসের মহানায়ক। বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী রাজনীতিবিদ এবং স্ট্রাটেজিষ্ট। তিনি বাঙ্গালীকে এক এক জন মুজিবে পরিণত করেছিলেন।

সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীন দেশ দিয়েছেন। তিনি স্বাধীন না করলে স্বাধীন দেশ পেতাম না। সংসদে এসে সংসদ সদস্য হয়ে বক্তব্যও দিতে পারতাম না। যারা বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, তারাই ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীরও প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই'।

বিএনপি দলীয় সংসদ নেতা হারুনুর রসীদ বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে বঙ্গবন্ধুর সিন্ধান্ত সঠিক ছিল। তিনি যদি পালিয়ে যেতেন বা ভারতে আশ্রয় নিতেন, তাহলে তাঁকে বিছিন্নতাবাদী নেতা বলা হতো। আজকে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক হয়, তার মধ্য দিয়ে কি শেখ মুজিবকে বড়-ছোট করা যাবে? স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে দীর্ঘ ২০ বছর শেখ মুজিবের কষ্টার্জিত সংগ্রাম, এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, সেটা তো অস্বীকারের কোনো পথ নেই, সেটা কেউ অস্বীকার করে না, অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার ভাষণের মধ্য দিয়ে সাধারণ আলোচনা শেষ হয়। তারপর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে যেদিন পবিত্র সংবিধান পাশ করা হয় সেদিন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া প্রদত্ত ভাষণটি শোনানোর মধ্য দিয়ে বিশেষ অধিবেশনের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

অধিবেশনের মূল বক্তা হিসেবে স্মারক বক্তব্য রেখেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি।

করোনা মহামারীর কারণে সংসদে সরাসরি অতিথি থাকার সুযোগ না থাকলেও সংসদ টিভির মাধ্যমে কোটি কোটি দর্শক এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে পেরেছে।

জাতির পক্ষ থেকে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের জাতির পিতাকে শ্রদ্ধা জানানো খুবই প্রয়োজন ছিল। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের বাইরে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল দলের সংসদ সদস্যরা একবাক্যে কৃতজ্ঞচিত্তে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করে যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা। ইমেইল: haldertapas80@gmail.com





সাক্ষাৎকার ও অভিমত সর্বশেষ খবর

সাক্ষাৎকার ও অভিমত এর সকল খবর