শনিবার, ২৪শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৪০৭ বিদেশি, সাজা শেষে ফেরার অপেক্ষায় ১৭২ *** সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত, রিসোর্টের ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল *** দ্রুততম মানব ইমরানুর, মুকুট ধরে রাখলেন শিরিনও *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণে সহায়তা করেছিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকের স্ত্রী, গ্রেপ্তার *** কোনো কিছুই পক্ষে নেই, কেন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সৌদি যুবরাজ *** ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন’ জানিয়ে নওগাঁয় মাইকিং *** ছাত্রীকে যৌন হয়রানির খবরে মহিলা মাদ্রাসায় আগুন, শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসা শিক্ষক পলাতক *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নিপীড়ন: মাদ্রাসাশিক্ষককে থাপ্পড়ের ভিডিও ভাইরাল, থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ *** বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের আগে সুখবর দিল বিসিবি

‘মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু জামায়াতের ঘাড়ে বোঝা হয়েই আছে’

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৬:৪৯ অপরাহ্ন, ৪ঠা জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, সেই ভূমিকার দায় স্বীকার এবং ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটি দেশের রাজনীতিতে বহু দশক ধরে আলোচিত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সেই বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে বিবিসি বাংলার সাবেক সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও পডকাস্টার সাবির মুস্তাফা আজ শনিবার, ৪ জুলাই, অনলাইন গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন-এ ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু জামায়াতের ঘাড়ে এখনও বোঝা হয়েই আছে’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ লিখেছেন।

সেখানে তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান এবং সেই ভূমিকা সম্পর্কে দলটির অনড় অবস্থান এখনো তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর একটি বড় বোঝা হয়ে রয়েছে।

সাবির মুস্তাফার লেখার সূত্রপাত হয়েছে জাতীয় সংসদ এবং সংসদের বাইরের দুটি সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় সংসদে ২৮ জুনের ভাষণে জামায়াতকে উদ্দেশ করে বলেন, তারা ১৯৭১ সালে নিজেদের ভূমিকার জন্য কখনো ক্ষমা চাননি। তার ভাষায়, যদি জামায়াত ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইত, তাহলে আজকের অনেক বিতর্ক থাকত না। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম একসময় প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, ১৯৭১ সালে জামায়াত কোনো ভুল করেনি।

এর জবাবে ১ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দলটি কোনো অপরাধ করেনি, তাই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার দাবি, তারা শুধু ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিল।

সাবির মুস্তাফা লিখেছেন, বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে জোটগত রাজনীতি করলেও এই বক্তব্য–পাল্টা বক্তব্য তাকে প্রায় ১৮ বছর আগের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সময়টা ছিল ২০০৯ সালের শুরু। আওয়ামী লীগ তখন সদ্য ক্ষমতায় এসেছে এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় জামায়াতের শীর্ষ নেতা ও আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক তার সঙ্গে দেখা করেন। বিচার নয়, বরং জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা করাই ছিল সেই বৈঠকের উদ্দেশ্য। কারণ রাজ্জাক উপলব্ধি করেছিলেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে দলটির ভাবমূর্তি আরও সংকটে পড়তে পারে।

সেই আলোচনায় সাবির মুস্তাফা তাকে বলেন, জামায়াতের সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের সংগঠনগত শক্তি নয়, বরং মধ্যবিত্ত সমাজে গ্রহণযোগ্যতার সংকট। তার মতে, ১৯৭১ সালের ভূমিকার কারণে জামায়াতকে অধিকাংশ মানুষ একটি ‘স্বাভাবিক’ রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখতে পারেন না। এই সংকট কাটাতে তিনি দুটি পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রথমত, ১৯৭১ সালে দলটির অবস্থান ভুল ছিল—এ কথা স্বীকার করে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব নেতা ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে জামায়াতের নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের দল থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং রাজনীতি থেকে অবসর নিতে হবে।

লেখক জানান, আব্দুর রাজ্জাক তখন জানতে চেয়েছিলেন, দুটি শর্তের একটি পালন করলেই হবে কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, না। তার মতে, এই দুটি পদক্ষেপ একসঙ্গে না নিলে ১৯৭১ সালের বোঝা কখনোই জামায়াতের কাঁধ থেকে নামবে না।

সাবির মুস্তাফার পর্যবেক্ষণ, সেই আলোচনার প্রায় ১৮ বছর পরও জামায়াতের অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। বরং মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, দলটি এখনো মনে করে তারা কোনো ভুল করেনি এবং ক্ষমা চাওয়ারও প্রয়োজন নেই।

তিনি মনে করিয়ে দেন, এই দীর্ঘ সময়ে দেশের রাজনীতি ও সমাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে। জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। গোলাম আযম ও দেলোয়ার হোসেন সাঈদী কারাগারে মারা গেছেন। কিন্তু এসব ঘটনার পরও দলটির অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।

একই সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জামায়াত নতুন নেতৃত্ব নিয়ে রাজনীতির মূলধারায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়েছে এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৬৮টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন করেছে। এই সাফল্য দলটির আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে।

সাবির মুস্তাফার মতে, জামায়াত এখন হয়তো বিশ্বাস করছে যে নতুন প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু নয়। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্য এবং জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৩১ শতাংশ ভোট পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে দলটির কাছে এখন আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আত্মসমালোচনা বা নতুন মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে না। বরং ‘আমরা কোনো অপরাধ করিনি, তাই ক্ষমা চাইব না’—এটাই যেন তাদের রাজনৈতিক মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

লেখক মনে করেন, মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের ব্যবহৃত ভাষারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ প্রতিহত করার যুক্তি তুলে ধরে তিনি মূলত জামায়াতের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থানের কথা বলে জামায়াতের নিজস্ব দায়কে অন্যদের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন।

সাবির মুস্তাফা লিখেছেন, পরওয়ার মুক্তিযুদ্ধকে ‘অর্ধশতাব্দী আগের মীমাংসিত বিষয়’ বলে উল্লেখ করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবশ্যই মীমাংসিত, কিন্তু জামায়াত যেভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, সেভাবে নয়।

তিনি যুক্তি দেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিদেশি ষড়যন্ত্র বা ভারতীয় আগ্রাসনের ফল ছিল না। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করার পরই সারা দেশে প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়ে। তার ভাষায়, অখণ্ড পাকিস্তানের কবর রচিত হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতেই, আর ২৬ মার্চ জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার’ আহ্বান এবং ‘যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা’ করার নির্দেশ সেই ভাষণেই ছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, কোনো বিদেশি শক্তির পরিকল্পিত সংঘাত নয়।

লেখকের মতে, এই যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী শুধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক সহযোগীই ছিল না; দলটির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর মাধ্যমে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তাই তিনি মনে করেন, জামায়াত শুধু রাজনৈতিক ভুল করেনি; তারা অপরাধও করেছে। এটাই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বয়ান।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, জামায়াতের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে তারা এখনো সেই অপরাধ স্বীকার করতে রাজি নয়। ফলে অনুশোচনা বা ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নও তাদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্তের মূল্য দলটিকে দীর্ঘদিন ধরেই দিতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দিতে হবে।

সাবির মুস্তাফা মনে করেন, মির্জা ফখরুলের বক্তব্যকে যদি জামায়াত কেবল রাজনৈতিক খোঁচা হিসেবে উড়িয়ে দিতে চায়, তাহলে সেটি হবে দূরদর্শিতার অভাব। কারণ ১৯৭১ সালের প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং নৈতিক দায়বোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইতিহাসে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় স্বীকারের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশে নাৎসি নিপীড়নের শিকারদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জার্মান চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্ট হাঁটু গেড়ে বসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধের জন্য জার্মানির নৈতিক দায় স্বীকার করেছিলেন। পরবর্তীতে জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারও একই ইতিহাস স্মরণ করে লজ্জা ও দায়বোধ প্রকাশ করেন।

একইভাবে ২০১৬ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কোমাগাতা মারু ঘটনার জন্য রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের দায় স্বীকার করে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চান। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতোয়ামাও দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের নিপীড়নের জন্য মাথা নত করে দুঃখ প্রকাশ করেন। এসব উদাহরণ দেখিয়ে অনেক গবেষক মনে করেন, ইতিহাসের ভয়াবহ অপরাধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দায় স্বীকার করা দুর্বলতার নয়, বরং নৈতিক সাহসের পরিচয়।

১৯৯৪ সালে হারানো নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে এক জনসভায় গোলাম আযম বলেন, ‘নবী ছাড়া কে দোষী নয়, দোষ কমবেশি সবারই আছে। তাই যারা আমার কোনো কাজকে ভুল মনে করেছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আমি তাঁদের সবার কাছে জানাচ্ছি। আপনাদের এই বেদনার সঙ্গে আমি শরিক, আমিও দুঃখিত।’

দলটির আরেক আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন, ‘আমাদের সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থানটা ভিন্ন ছিল—এটা সকলে জানে।’ কিন্তু তিনি কখনো সরাসরি ক্ষমা চাননি। বরং আরেক জনসভায় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘জামায়াতে ইসলামী কোনো অবস্থায় লুটপাটে শরিক হয়নি। ধর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না।’

জামায়াতের বর্তমান আমির শফিকুর রহমান অনেকটা তার পূর্বসূরীদের সুরেই কথা বলছেন। ২০২৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কয়েকবারই একাত্তরের প্রশ্নে বক্তব্য দিয়েছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের দায় স্বীকার কেমন হওয়া উচিত। বিভিন্ন সময়ে দলটির নেতারা ‘দুঃখ প্রকাশ’ বা ‘কষ্ট পেয়ে থাকলে মাফ চাই’ ধরনের বক্তব্য দিলেও তা নির্দিষ্টভাবে ১৯৭১ সালের ভূমিকার দায় স্বীকার হিসেবে বিবেচিত হয়নি।

গবেষক, কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সমালোচনা করলেও ক্ষমতার প্রয়োজনে আবার তাদের সঙ্গেই জোট করেছে। ফলে জামায়াতের ওপর স্পষ্টভাবে ক্ষমা চাওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়নি। তিনি আরও বলেন, জামায়াতের যেসব ক্ষমা চাওয়ার বক্তব্য শোনা গেছে, সেগুলোও মূলত রাজনৈতিক চাপে দেওয়া, আন্তরিক আত্মসমালোচনার প্রকাশ নয়।

তিনি বলেন, ‘কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে ১৯৭১ সালের গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে মামলা করেনি। এমনকি তাদের যে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল, তা-ও ১৯৭১-এর অপরাধের জন্য নয়, বরং তাদের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে হয়েছিল।’

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী মাঝে মাঝে ক্ষমা চাওয়ার কথা বললেও তা মূলত রাজনৈতিক চাপে পড়ে বলে, যা তাদের আন্তরিক ইচ্ছা বা অপরাধ স্বীকারের সাহস থেকে আসে না।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলছেন, ১৯৭১ সালের অপরাধগুলোকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার না করে উল্টো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার প্রবণতা থেকেই বোঝা যায়, অভিযুক্ত পক্ষ এখনো সেই ইতিহাস মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তার মতে, বর্তমান নেতৃত্ব সরাসরি যুদ্ধাপরাধে যুক্ত না থাকলেও যদি তারা সেই একই রাজনীতিকে ধারণ করে এবং অতীতকে প্রত্যাখ্যান না করে, তবে নৈতিক দায় তাদেরও বহন করতে হবে।

১৯৭১ সালে দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা ‘ক্ষমার অযোগ্য’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে যারা জামায়াতে আছেন, তারা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও যদি তারা সেই একই রাজনীতিকে ধারণ করেন বা সেই আদর্শকে প্রত্যাখ্যান না করেন, তবে তারাও সমানভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।’

সাবির মুস্তাফা তার নিবন্ধের শেষাংশে সতর্ক করে বলেছেন, অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ, নির্বাচনী সাফল্য কিংবা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করলেই ১৯৭১ সালের ইতিহাস মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। তার মতে, যদি জামায়াত মনে করে যে ক্ষমা না চেয়েও তারা পুরোপুরি একটি ‘স্বাভাবিক’ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে, তাহলে সেটি হবে ১৯৭১ সালের পর দলটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

আনু মুহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমদ সাবির মুস্তাফা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250