মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

তারেক রহমান সরকারের প্রতি আস্থা রাখছে দিল্লি, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে চুপ থাকবে

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৭:০৫ অপরাহ্ন, ৩০শে এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত তার দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে ঘিরে সৃষ্ট সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ভারত আপাতত ‘কৌশলগত নীরবতা’ বজায় রাখার নীতি নিয়েছে, যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি না হয়।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে বাস্তববাদী কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার চেয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে প্রকাশ্য সমর্থন বা বিরোধিতা—দুটিই এড়িয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। ঢাকা ও নয়াদিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র সুখবর ডটকমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি করছেন যে, বিএনপি বর্তমানে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করছে। বিশেষ করে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে—যা ভারতের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির অতীতের ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্যতম কারণ ছিল দেশটির কাছে।

এই প্রেক্ষাপটে দিল্লির দৃষ্টিতে বিএনপি এখন আর আগের মতো ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ রাজনৈতিক শক্তি নয়; বরং একটি ‘রূপান্তরশীল’ দল, যা মধ্যপন্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একাধিক ভারতীয় বিশ্লেষক মনে করছেন, বিএনপির এই কৌশলগত পরিবর্তন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজ বৃহস্পতিবার সুখবর ডটকমকে বলেন, “ভারত এখন মূলত স্থিতিশীলতা চায়। তারা দেখছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সতর্ক।” এই অবস্থান ভারতের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে তারেক রহমান সরকারের সম্পর্ককে ‘অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন কূটনীতিকরা। উভয় পক্ষই বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে। নয়াদিল্লি মনে করছে, এই সম্পর্ক একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে—যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের চেয়ে বাস্তব সহযোগিতাই মুখ্য হবে।

তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির মাঝেও একটি স্পর্শকাতর ইস্যু রয়ে গেছে—আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। অতীতে ভারত আওয়ামী লীগকে তার ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান প্রকাশ্যে ধরে রাখা দিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভারত প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেয়, তবে তা তারেক রহমান সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নয়াদিল্লি আপাতত ‘নীরব সমর্থন’ বা ‘নিরপেক্ষ অবস্থানের’ পথ বেছে নিয়েছে।

এই নীতির পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসও। শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে যে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা দিল্লির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের পর রাজপথে যে ক্ষোভ দেখা গেছে, তা ভারতকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে।

ভারতীয় হাই-কমিশনের একটি সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, “বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। অতীতে যেভাবে একপাক্ষিকভাবে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে, এখন সেই পন্থা কার্যকর নয়।” এই উপলব্ধি থেকেই ভারত এখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, বিএনপি সরকারও এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে যে উদার ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছে, সেটি দখলের কৌশল নিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে তারা নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ ও ‘দায়িত্বশীল’ শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে—যা আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কৌশল সফল হলে বিএনপি শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারবে। বিশেষ করে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সমর্থন বা অন্তত নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা—এই প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে সবকিছু এত সরল নয়। জাতিসংঘের হিসাবে ২০২৪ সালের দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিচারিক প্রক্রিয়া—এসব ইস্যু এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংবেদনশীল। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে দিল্লির নীরবতা নানা জল্পনা তৈরি করছে।

ভারতের একটি নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, “এই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং বহুস্তরীয়। এখানে কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হয়।” ফলে এই ইস্যুতে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক একটি নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে—যেখানে আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারেক রহমান সরকারের প্রতি ভারতের ক্রমবর্ধমান আস্থা এবং আওয়ামী লীগের প্রশ্নে নীরবতা—এই দুই প্রবণতা সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উভয় পক্ষ কতটা বাস্তববাদী থাকতে পারে তার ওপর। যদি বিএনপি সরকার তার বর্তমান মধ্যপন্থী ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অবস্থান বজায় রাখে এবং ভারতও তার ‘হস্তক্ষেপ না করার’ নীতি অনুসরণ করে, তবে ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্ক সত্যিই একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, এই পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণ শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে—যেখানে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক স্বার্থই হয়ে উঠবে প্রধান চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশ-ভারত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250