ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বলেছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে এমন একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার সঙ্গে তার সরাসরি কোনো সম্পর্কই ছিল না। এরপর তাকে আবার আপিল বিভাগের একটি রায়ে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। এটি কোনোভাবেই ফৌজদারি অপরাধ হওয়ার কথা নয়। কোনো গ্রহণযোগ্য আইনি কারণ ছাড়াই খায়রুল হক প্রায় পাঁচ মাস ধরে কারাগারে আছেন। বিষয়টিতে সরকারের 'নির্বাচনী প্রতিশোধ' নেওয়া দেখছেন তিনি।
তার মতে, আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যখন কোনো তদন্তই শুরু হয়নি, তখন আউয়ালকে আগে জেলে নেওয়া হলো কেন? আউয়ালের বিরুদ্ধে যে তিনটি নতুন অভিযোগ আনা হয়েছে (প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, দেশদ্রোহ), সেগুলোর কোনোটিই সত্যের সঙ্গে মেলে না। তার বিরুদ্ধে আনা দেশদ্রোহিতার অভিযোগ পুরোপুরি অযৌক্তিক।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ এক নেতার করা মামলায় একইভাবে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল পাঁচ মাস ধরে জামিন ছাড়াই কারাগারে আছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আউয়ালের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোতে তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কোনো ভূমিকা ছিল না। এফআইআরে প্রাথমিকভাবে যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে, এটা প্রমাণ হলেও তার যদি সাজা হয়, তার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ছয় মাস। অথচ আউয়াল ইতিমধ্যেই পাঁচ মাস জেলে রয়েছেন।
বার্গম্যানের আক্ষেপ, আউয়ালের গ্রেপ্তার ও বিদ্যমান আটকাদেশ বাংলাদেশে অপরাধ বিচারব্যবস্থার আরও একটি ব্যর্থতার উদাহরণ—যেখানে বহু মানুষকে প্রমাণের ভিত্তিতে নয় বরং রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য আটক করা হয়। এটি বর্তমান সরকারের অধীনে একটি নিয়মিত ধারা। এসব ঘটনা বিগত সরকারের আমলে ঘটা অবিচারের মতোই। কিন্তু সে সময় এই কেলেঙ্কারিগুলোর যারা কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন, আজ সেই একই মানুষগুলো তা মেনে নিচ্ছেন, উদ্যাপন করছেন বা দেখেও না দেখার ভান করছেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেমন যথেচ্ছ আটকের পক্ষে নানা যুক্তি দেখাতো তেমনই করছেন এখনকার রাজনীতিবিদ ও নেতারা। আইন সঠিকভাবে না মেনে যথেচ্ছ আটক তখনো অবিচার ছিল, এখনো তা অবিচার। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, খুব কম মানুষই এই সত্যটা স্বীকার করছেন; আর তারও চেয়ে কম মানুষ মুখ খুলছেন এ বিষয়ে।
দৈনিক প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেছেন। তার লেখাটি আজ বৃহস্পতিবার (১১ই ডিসেম্বর) প্রকাশিত হয়েছে 'ফরমার সিইসি আউয়ালস ডিটেনশন অ্যান্ড ইলেকটোরাল রিট্রিবিউশন' শিরোনামে। একই লেখার বাংলা অনুবাদ 'সাবেক সিইসি আউয়ালের আটকাদেশ ও নির্বাচনী প্রতিশোধ' শিরোনামে পত্রিকাটির বাংলা ওয়েব সংস্করণে আজ প্রকাশিত হয়েছে। দুটি লেখারই লিংক নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন বার্গম্যান।
ডেভিড বার্গম্যান উপসম্পাদকীয়তে বলেন, বিএনপির নেতার করা মামলার এফআইআরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর কাজী হাবিবুল আউয়াল ‘আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন’। বিএনপি যে ওই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী ছিল না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া কয়েকটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ‘ডামি’ প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে বা জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করেছে—সেখানে নির্বাচন কমিশনের কোনো ভূমিকা ছিল না। ফলে এ বিষয়ে তাদের (নির্বাচন কমিশন) ওপর কোনো দায়ও পড়ে না। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও নির্বাচন বাতিল করার কোনো ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ছিল না।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ার হার নিয়ে আউয়াল কী ভুলে ২৭ শতাংশ বলেছিলেন কিনা, সেটা বোঝার একমাত্র উপায় ছিল নিরপেক্ষ তদন্ত করা। সেই তদন্তে নির্বাচনের কাগজপত্র (নথি) পরীক্ষা করা এবং অন্তত পক্ষে কিছু ব্যালট বা ভোটের কাগজ গুনে দেখা দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের কোনো তদন্ত শুরুই করা হয়নি। তার আগেই হাবিবুল আউয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বার্গম্যান লেখেন, হাবিবুল আউয়ালকে গ্রেপ্তার করার পরদিনই সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের কাজ ছিল গত তিনটি নির্বাচনে কী কী অনিয়ম হয়েছে এবং সেখানে কোনো অপরাধমূলক কাজ হয়েছে কি না—এসব খতিয়ে দেখা। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এগুলোই ছিল সেই অভিযোগ, যেগুলোর কারণে আউয়ালকে আটক করা হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওই কমিশন তাদের তদন্তের কাজ শেষ করেছে সম্প্রতি। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যখন কোনো তদন্তই শুরু হয়নি, তখন আউয়ালকে আগে জেলে নেওয়া হলো কেন?
তিনি লেখেন, আউয়ালের বিরুদ্ধে এফআইআরে প্রাথমিকভাবে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো হলো ভোট প্রভাবিত করার জন্য ঘুষ দেওয়া (ধারা ১৭১ বি); কারও পরিচয় ব্যবহার করে ভোট দেওয়া (ধারা ১৭১ ডি); নির্বাচনের খরচের হিসাব না রাখা (ধারা ১৭১ আই); ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য দেওয়া (ধারা ১৭১ জি) এবং নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত অবৈধ অর্থ প্রদান (ধারা ১৭১ এইচ)।
তিনি বলেন, এই ধারাগুলোর মধ্যে শুধু ১৭১ জি ছাড়া অন্য কোনো ধারা আউয়ালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া সম্ভব নয়। আর ১৭১ জি প্রমাণ হলেও তার সাজা হলো জরিমানা, কারাদণ্ড নয়। আর যদি কোনো ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ধারা ১৭১ জির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাজা হয়, তার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ছয় মাস। অথচ আউয়াল ইতিমধ্যেই পাঁচ মাস জেলে রয়েছেন।
তিনি লেখেন, গ্রেপ্তারের এক সপ্তাহ পর আউয়ালের বিরুদ্ধে আরও তিনটি অভিযোগ যোগ করা হয়। এগুলো হলো: ১. ধারা ৪২০-কাউকে ঠকিয়ে বা প্রতারণা করে কোনো সম্পদ পাওয়ার, নষ্ট করার বা পরিবর্তন করার অভিযোগ। ২. ধারা ৪০৬-কারও বিশ্বাস ভঙ্গ করে বা অসৎভাবে কোনো সম্পদ ব্যবহার করার অভিযোগ। ৩. ধারা ১২৪ এ-সরকার বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা দেশদ্রোহের অভিযোগ। আউয়ালের বিরুদ্ধে যে তিনটি নতুন অভিযোগ আনা হয়েছে (প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, দেশদ্রোহ), সেগুলোর কোনোটিই সত্যের সঙ্গে মেলে না।
তিনি বলেন, প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের সাথে জড়িত কোনো নির্দিষ্ট সম্পদ এখানে নেই, আর দেশদ্রোহিতার অভিযোগ পুরোপুরি অযৌক্তিক। ধারা ১২৪–এ সেসব কথাকে অপরাধ বলে সংজ্ঞায়িত করে যা ‘সরকারের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞা সৃষ্টি করে বা সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছড়ায়’। আউয়ালের কোনো কথাই এমন মানদণ্ড পূরণ করে না।
খবরটি শেয়ার করুন