ছবি: সংগৃহীত
আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান জানিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ফেরত পাঠানো উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান। তার দাবি, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে ভারত আইনগতভাবেই প্রায় বাধ্য শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে।
গতকাল শনিবার (২২শে নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের এক কর্ম অধিবেশনে এ কথা বলেন মুনিরুজ্জামান। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ শীর্ষক তিন দিনের এই সম্মেলনের আয়োজন করে। তার এই বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী আলোচনা চলছে নেটিজেনদের মধ্যে। অনেকের প্রশ্ন, প্রত্যর্পণ চুক্তি মেনে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে ভারত? বাংলাদেশের কাছে তাকে ফেরত দিতে ভারত কি প্রায় বাধ্য?
বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির মধ্যে থাকা বেশ কয়েকটি শর্তের জন্যই ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয় বলে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকাকে জানাচ্ছেন দেশটির বিশেষজ্ঞেরা। এই প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার বলেন, 'ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরাতে বাধ্য নয়। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত চুক্তি থাকলেও সেখানে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যার জন্য নয়াদিল্লি সেটি মানতে বাধ্য নয়।'
প্রত্যর্পণ চুক্তির ওই শর্তের কথা বলে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারত বাধ্য নয় বলে জানান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ীও। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, 'ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ নিয়ে চুক্তি রয়েছে। কিন্তু ১৭ই নভেম্বরের রায়ের পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ওই চুক্তিতে থাকা নিয়ম অনুসারেই ভারত হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়।'
এই প্রসঙ্গে আইনগত দিকটি ব্যাখ্যা করে কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী অরিন্দম দাস বলেন, 'শেখ হাসিনা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু দেশে না-থাকার জন্য শেখ হাসিনাকে যদি তা করতে বাধা দেওয়া হয়, তবে তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।'
একই সঙ্গে তিনি জানান, ট্রাইবুনালের রায়ের প্রতিলিপি পাঠানো হলেও ভারত তা মানতে বাধ্য নয়। তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যদি কোনও দেশে কারও জীবনের ঝুঁকি থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া দেশ তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও এই আইনের কথা তুলে ধরতে পারে ভারত।'
চুক্তিতে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, অপরাধটির যদি রাজনৈতিক চরিত্র থাকে, তা হলে প্রত্যর্পণ করা হবে না। খুন, গুম করা এবং অত্যাচার (যেগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে শেখ হাসিনা দায়ী) রাজনৈতিক অপরাধের তালিকায় রাখা হবে না বলেও চুক্তিতে বলা হয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না।
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না-করার জন্য এই যুক্তিগুলো খাড়া করতে পারে ভারত। শেখ হাসিনা নিজেও বারবারই তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। বিচারের নামে প্রহসনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হস্তান্তরের জন্য ভারতকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। চিঠিতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও ফেরত চাওয়া হয়েছে। আজ রোববার (২৩শে নভেম্বর) পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত পরশুদিন (শুক্রবার) দিল্লির বাংলাদেশ মিশন থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুদিন আগে চিঠি সরাসরি দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে।
গত বছরের জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে গত ১৭ই নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর তাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে প্রথমবারের মতো চিঠি দিল বাংলাদেশ।
খবরটি শেয়ার করুন