ছবি: সংগৃহীত
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের এক-এগারো শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা, গণতন্ত্র, সামরিক প্রভাব এবং নাগরিক অধিকারের জটিল এক সন্ধিক্ষণ। সেনাসমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সেই সময়কে ঘিরে বহু বিতর্ক, অভিযোগ ও অমীমাংসিত প্রশ্ন আজও সমাজে আলোচিত। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং পরবর্তী নির্বাসিত জীবনের প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে এসেছে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
মানবজমিনের মুদ্রিত সংস্করণে আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম—‘অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য: তারেক রহমানকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের সময় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআই পরিচালিত জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। প্রতিবেদনে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের জবানবন্দি, বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এই নির্যাতন ছিল পরিকল্পিত এবং উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনাধীন।
মতিউর রহমান চৌধুরী তার লেখায় মূলত তিনটি বিষয় সামনে আনতে চেয়েছেন। প্রথমত, এক-এগারোর সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ কীভাবে আইন ও মানবাধিকারের সীমা অতিক্রম করেছিল। দ্বিতীয়ত, তারেক রহমানের ওপর চালানো নির্যাতন শুধু ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে একটি দল ও নেতৃত্বকে দুর্বল করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ ছিল। তৃতীয়ত, এত গুরুতর অভিযোগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও দীর্ঘদিন বিচারহীনতা বহাল থাকা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
প্রতিবেদনে যে বর্ণনা উঠে এসেছে, তা নিছক কোনো রাজনৈতিক ভাষ্য নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয়। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখা, হাত বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা—এসব অভিযোগ প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে এসেছে।
এই অভিযোগগুলো নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি দাবি করে আসছিল যে, এক-এগারের সময় তাদের শীর্ষ নেতাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। তবে এবার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এ কারণে যে, প্রতিবেদনে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নাম, দায়িত্ব ও সম্ভাব্য ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক-এগারোর সময় বাংলাদেশ কার্যত একটি “হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা”র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। বাইরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামরিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রবল। সে সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দুই দলের বহু শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ এক আলোচনায় বলেছিলেন, “এক-এগারোর সময় গণতন্ত্রকে স্থগিত রেখে একটি প্রশাসনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সেই পরীক্ষাকে ব্যর্থ করে।” তার মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা হলে রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস তৈরি হয়।
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্যও একই ধরনের। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলো যদি সত্য হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় এবং বিচারবহির্ভূত আচরণ কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তাদের মতে, তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের অভিযোগকে মানবিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কোনো নাগরিক, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং পুরো বিচারব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি। মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখাটি সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে—রাষ্ট্র কি কখনো নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিল?
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্যাতনের কারণে তারেক রহমান দীর্ঘদিন শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন এবং চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে থাকতে হয়েছে। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। এই দীর্ঘ সময় তার রাজনৈতিক অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাসিত জীবনে থেকেও তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতিকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা ও এক-এগারের অভিজ্ঞতা তাকে ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বলেই রাজনৈতিক মহলে ধারণা রয়েছে। মানবজমিনের প্রতিবেদনে সেই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির দিকটিও উঠে এসেছে।
এই পুরো প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিচার ও জবাবদিহি। রাষ্ট্র যদি কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে থাকে, তবে তার তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত কি না। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারহীনতা শেষ পর্যন্ত আরও বড় সংকট তৈরি করে। দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো অতীতের রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের তদন্ত করে “ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন” মডেল অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশেও এক-এগারের সময়কার ঘটনাগুলো নিয়ে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিশন গঠনের দাবি নতুন নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে অতীতের অন্ধকার অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি হওয়া জরুরি। কারণ ইতিহাস চাপা দিয়ে রাখা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিযোগকে উপেক্ষা করা যায় না। এটি মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্ন।
মতিউর রহমান চৌধুরীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সেই চাপা পড়ে থাকা ইতিহাসকে আবার সামনে এনেছে। তার লেখার ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দুর্ভোগ তুলে ধরতে চাননি; বরং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে জাতিকে ভাবতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও যদি অন্যায়ের বিচার না হয়, তবে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বলই থেকে যায়।
এক-এগারের সময় বাংলাদেশ এক ভয়াবহ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সময় শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন প্রশ্ন উঠছে—সেসব ঘটনার প্রকৃত সত্য কী ছিল, আর কতটা ছিল রাজনৈতিক প্রকৌশল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিকোণ নয়, মানবিক ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও ঘটনাগুলো মূল্যায়ন করতে হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি তার ক্ষমতায় নয়, বরং আইনের প্রতি আনুগত্যে। আর সেই কারণেই এক-এগারের সময়কার নির্যাতনের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার আজ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন