মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

জাইমা রহমানকে নিয়ে ফরিদুর রেজা সাগর এবার নতুন বই লিখছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:১৩ অপরাহ্ন, ১লা মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার আকাশে শীতের নরম রোদ, বিমানবন্দরে নেমে বিস্ময়ে ভরা চোখ—এই আবহ দিয়েই শুরু হয় কথাসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের লেখা, যার কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা এক তরুণীর চোখে বাংলাদেশকে দেখার এই বর্ণনা যেমন আবেগঘন, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তার শৈশব, বেড়ে ওঠা, পরিবার, শিক্ষা এবং সমাজ-ভাবনার একটি বিস্তৃত চিত্র।

একুশে পদকপ্রাপ্ত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগরের লেখাটি আজ শুক্রবার, ১ মে দৈনিক মানবজমিনের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশের পরপরই এটি শুধু একটি সাহিত্যিক রচনা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোচনাতেও উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখাটি ঘিরে লেখককে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। লেখাটির শিরোনাম ‘জাইমার বই পড়া’।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে এটিই ফরিদুর রেজা সাগরের প্রথম লেখা। সূত্র জানায়, জাইমা রহমানকে নিয়ে নতুন একটি বই লিখছেন ফরিদুর রেজা সাগর। এর আগেও তাকে নিয়ে তিনি শিশুতোষ বই লিখেছেন।

সাগরের বয়ানে জাইমার শৈশবের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বই। আট বছর বয়সী এক কৌতূহলী শিশুর বইয়ের প্রতি আকর্ষণ, বাবার কাছে বইয়ের আবদার, রঙিন প্রচ্ছদের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা—এসব চিত্রায়ন তাকে এক ‘বইপাগল’ শিশু হিসেবে তুলে ধরে। যা পাঠকদের মুগ্ধ করছে।

“হাকল বেরি ফিন”, রুশ রূপকথা কিংবা ফেলুদার মতো চরিত্র—সবকিছুতেই জাইমা রহমানের আগ্রহ ছিল। এই বর্ণনায় শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, বরং একটি শিশুর কল্পনার জগতও ফুটে ওঠে—যেখানে সে পাখির দেশে, ফুলের দেশে কিংবা পরীর দেশে ঘুরে বেড়াতে চায়। ফরিদুর রেজা সাগরের ভাষায়, বই-ই ছিল জাইমা রহমানের জ্ঞানের প্রধান দরজা, যা তাকে নতুন নতুন জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

এই শৈশব স্মৃতির সঙ্গে জুড়ে যায় বাংলা একাডেমির আয়োজিত একুশের বইমেলার প্রসঙ্গ। টেলিভিশনের পর্দায় বইমেলার খবর দেখে সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু দীর্ঘ পথ হাঁটার সীমাবদ্ধতা—এই বাস্তবতা থেকেই জাইমার মনে জন্ম নেয় একটি প্রশ্ন: ছোটদের জন্য কি আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই? সাগরের দাবি অনুযায়ী, এই প্রশ্নই পরে বইমেলায় শিশু কর্নার তৈরির প্রেরণা হয়ে ওঠে। শিশুদের জন্য পরিবেশ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এটি লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা জাইমাকে একজন সচেতন ও সংবেদনশীল শিশু হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই প্রসঙ্গে উঠে আসে তার পারিবারিক পরিচয়। জাইমার দাদা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দাদি সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বাবা তারেক রহমান—তিনজনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ফলে জাইমার শৈশব শুধু একটি সাধারণ পারিবারিক পরিবেশে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। সাগর এই পারিবারিক ঐতিহ্যকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে পরিবার থেকেই জাইমা মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সমাজসেবার শিক্ষা পেয়েছেন।

২০০৪ সালে সাগর ‘জাইমার বইমেলা’ নামে একটি শিশুতোষ বই লেখেন, যা প্রকাশ করে অনন্যা প্রকাশনী। বইটির ইংরেজি সংস্করণও তখন প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল জাইমা রহমানকে নিয়ে লেখা দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো লেখকের প্রথম বই। ওই বছরই ফরিদুর রেজা সাগর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তখন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে চারদলের জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। 

এই তথ্য সাগর তার আজকের মানবজমিনের লেখায় উল্লেখ করে বর্তমান লেখার সঙ্গে অতীতের একটি সংযোগ তৈরি করেছেন। তবে এখানেই শুরু হয় বিতর্কের একটি স্তর। কারণ, সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে সাগরের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে তিনি ওই সরকারের ‘গুণমুগ্ধ’ ছিলেন। তখন বেসরকারি টিভি চ্যানেল আই বিএনপির বিরুদ্ধে এমন প্রতিবেদন প্রচার করেছে, সেগুলোতে দলটিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সাগর চ্যানেল আইয়ের অন্যতম কর্ণধার।

বর্তমান সময়ে ফিরে এসে সাগর দেখান, জাইমা এখন আর সেই আট বছরের শিশু নন; তিনি একজন শিক্ষিত, পরিণত নারী। যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টারি পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসেছেন এবং বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। জনসভা, কৃষক কার্ড বিতরণ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি তুলে ধরে সাগর একটি ইতিবাচক ও সক্রিয় চরিত্র নির্মাণ করেছেন।

একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও প্রটোকলের কারণে জাইমার চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা তার জীবনের একটি বাস্তব দিক।

এই বর্ণনার ধারাবাহিকতায় আসে তার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আগ্রহের প্রসঙ্গ। সিনেমা হলে যাওয়া, খেলা দেখা—এসবের পাশাপাশি তিনি ছুটে যান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে হাজার হাজার বই দেখে বিস্মিত হওয়া, বই পড়া কর্মসূচি সম্পর্কে জানা এবং নিজে বই কেনা—এসব বিষয় তার জ্ঞানপিপাসু মনোভাবকে তুলে ধরে। সাগর এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন—একটি দেশের উন্নয়নে অর্থনীতির পাশাপাশি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। জাইমার ভাবনায়ও এই বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তবে এই পুরো বয়ান একমুখী প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। লেখাটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফেসবুক ব্যবহারকারী রাশেদ করিম লিখেছেন, “জাইমার বইপ্রেম অনুপ্রেরণাদায়ক, কিন্তু এটাকে রাজনৈতিক ইমেজ তৈরির অংশ বানানো ঠিক না।” অন্যদিকে সাদিয়া ইসলাম মন্তব্য করেন, “শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা একজন তরুণী দেশের কাজে যুক্ত হচ্ছেন—এটা ইতিবাচক দিক।” নাহিয়ান চৌধুরী বলেন, “সাগরের লেখায় সাহিত্য কম, রাজনৈতিক বার্তা বেশি।”

এই প্রতিক্রিয়াগুলোই ইঙ্গিত দেয়, লেখাটি শুধু সাহিত্যিক মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফরিদুর রেজা সাগরের নানা সরকারের আমলে নিজস্ব অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তিনি ২০১৬ সালে একুশে পদক পেয়েছিলেন, যা দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ওই সরকারের প্রশংসা করায়। ফলে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের ঘিরে ইতিবাচক বয়ান তৈরি করেছেন।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা বলেন, সাগরের লেখায় সাহিত্যিক গুণ আছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতা প্রশ্ন তৈরি করে। এটি তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে। শিশুসাহিত্যে তার অবদান অস্বীকার করা যাবে না, তবে জনপরিসরে তার লেখাকে নিরপেক্ষ বলা কঠিন।

এই সমালোচনার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—সাগরের লেখাটি জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাইমার ব্যক্তিত্ব, তার বইপ্রেম, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পৃক্ততা—এসব বিষয় যেমন ইতিবাচকভাবে উঠে এসেছে, তেমনি লেখকের অবস্থান ও উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে এটি এক ধরনের দ্বিমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে—একদিকে প্রশংসা, অন্যদিকে সংশয়।

সবশেষে বলা যায়, ‘জাইমার বই পড়া’ শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে লেখা নয়; এটি বাংলাদেশের সমসাময়িক সমাজ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন একজন বইপ্রেমী তরুণীর গল্প আছে, তেমনি আছে একজন লেখকের অবস্থান, সময়ের পরিবর্তন এবং জনমতের প্রতিফলন। এই দ্বৈততা থেকেই লেখাটি গুরুত্ব পায়—এটি একইসঙ্গে অনুপ্রেরণামূলক এবং বিতর্কিত।

ফরিদুর রেজা সাগর

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250