ছবি: সংগৃহীত
দেশে বজ্রপাত এখন আর শুধু একটি মৌসুমি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং গ্রামীণ জীবনে এক ধরনের সামাজিক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ ঘিরে “চুরি হয়ে যাওয়ার” আশঙ্কা বহু এলাকায় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, অনেক পরিবার কবর দেওয়ার পরও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে।
কোথাও কোথাও আবার মৃতদেহ বাড়ির আঙিনায় বা গরুর ঘরের পাশে কবর দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। প্রশ্ন উঠছে—একটি মরদেহকে ঘিরে এই অস্বাভাবিক আতঙ্ক কেন তৈরি হচ্ছে?
বজ্রপাতে নিহতদের মরদেহ চুরি নিয়ে আতঙ্কের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে দীর্ঘদিনের কুসংস্কার। গ্রামীণ সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত আছে—বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করা মানুষের শরীর “বিশেষ শক্তি” বা “মূল্যবান উপাদানে” রূপান্তরিত হয়। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের মরদেহে প্রাকৃতিক চুম্বকীয় গুণ তৈরি হয়, আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, এসব মৃতদেহের হাড়-গোড় জাদুবিদ্যা বা অলৌকিক সাধনায় ব্যবহৃত হতে পারে।
এই বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা টিকে আছে। ফলে বজ্রপাতে কেউ মারা গেলে অনেক পরিবারই মরদেহ দ্রুত দাফন করলেও স্বস্তিতে থাকতে পারে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক চিকিৎসক ডা. সোহেল মাহমুদের মতে, এটি সম্পূর্ণ অন্ধবিশ্বাস। তিনি বলেন, “বজ্রপাতে মৃত্যু আর সাধারণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু—দুটিই শারীরিকভাবে একই ধরনের। এর মধ্যে কোনো ধরনের ধাতব বা চুম্বকীয় পরিবর্তন ঘটে না।”
বৈজ্ঞানিকভাবে বজ্রপাত হলো মেঘে জমা বিদ্যুতের আকস্মিক নির্গমন। যখন কোনো মানুষ বা প্রাণী এতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তখন শরীরে বৈদ্যুতিক আঘাতজনিত ক্ষতি হয়, কিন্তু কোনো “বিশেষ পদার্থ” তৈরি হয় না।
তবে গ্রামীণ সমাজে এই সহজ সত্যটি বহু ক্ষেত্রে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে নানা ধরনের গল্প ও গুজবই বেশি প্রভাব ফেলেছে।
কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন, বজ্রপাতে মৃত মানুষের দেহ চুম্বকের মতো কাজ করে, ফলে “মূল্যবান ধাতু” আকর্ষণ করতে পারে। এই ধরনের ভুল ধারণা থেকেই মরদেহ চুরির ভয় তৈরি হয়।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর থানার মির্জাপুর গ্রামের একটি ঘটনা এই আতঙ্কের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সেখানে রুপালি নামের এক নারী জানান, প্রায় ১৮ বছর আগে তার স্বামী বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। তখন থেকেই তিনি আতঙ্কে ছিলেন যে মরদেহ চুরি হয়ে যেতে পারে। সেই ভয়ে তারা স্বামীর দেহ কবরস্থানে না রেখে বাড়ির কাছেই দাফন করেন।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বিভিন্ন সময় নাটোর, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে নিহতদের মরদেহ পাহারা দেওয়া বা বাড়ির ভেতরে কবর দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বজ্রপাতে মৃতদেহ চুরি হওয়ার পেছনে কোনো বাস্তব বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও গ্রাম্য ওঝা-কবিরাজদের একটি চক্র এসব কুসংস্কারকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করে থাকে।
তাদের মতে, বজ্রপাতে মৃতদেহ অনেক কাজে লাগে—এমন ভুয়া বিশ্বাস থেকেই কিছু মানুষ লাশ চুরির চেষ্টা করে। বাস্তবে এগুলো সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ধারণা। এ ধরনের ঘটনায় কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, মৃতদেহের কোনো বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত মূল্য নেই যা চুরি করে ব্যবহার করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বজ্রপাতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাইমস (রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম)-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ৩.৩৬ মিলিয়ন বজ্রপাত ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে দূষণেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, গরম বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, যা বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তবে বজ্রপাতে মৃতদেহ চুরি নিয়ে এই কুসংস্কার শুধু ব্যক্তিগত ভয় তৈরি করছে না, বরং সামাজিক আচরণেও প্রভাব ফেলছে। অনেক পরিবার কবর দেওয়ার পর রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার কবর সিমেন্ট দিয়ে পাকা করে ফেলার ঘটনাও ঘটছে।
এ ধরনের আচরণ শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং শোকাহত পরিবারের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আতঙ্ক দূর করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাবই এই ধরনের কুসংস্কারকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে। গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা না থাকায় গুজব সহজেই মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হয়। ফলে বজ্রপাতে মৃত্যুর মতো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা সামাজিক আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে। আর সেই আতঙ্ক থেকেই তৈরি হচ্ছে মৃতদেহ চুরির ভয়।
বজ্রপাতে নিহতদের মরদেহ চুরি নিয়ে আতঙ্ক মূলত বাস্তবতার চেয়ে কুসংস্কার ও গুজবনির্ভর এক মানসিক নির্মাণ। বিজ্ঞান বলছে, এসব মরদেহের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই, যা চুরি বা ব্যবহারের যোগ্য হতে পারে। তবুও দীর্ঘদিনের অন্ধবিশ্বাস, গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রভাব এবং সচেতনতার অভাবে এই ভয় এখনো সমাজে টিকে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কুসংস্কার দূর করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, গণমাধ্যমের সচেতন ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণা জরুরি। না হলে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু প্রাণহানিই ঘটাবে না, বরং সমাজে অযৌক্তিক আতঙ্ককেও আরও গভীর করে তুলবে।
খবরটি শেয়ার করুন