ছবি: সংগৃহীত
গত বছর বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। তার ভাগনি (শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে) টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেনের নাগরিক। তিনি দেশটির পার্লামেন্টারি আসনের সংসদ সদস্য। দুর্নীতির অভিযোগের মুখে গত জানুয়ারিতে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত ব্রিটেনের মন্ত্রী ছিলেন টিউলিপ। ৪২ বছর বয়সী টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বেশ ঘনিষ্ঠ।
বাংলাদেশে বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তার কাছে নতুন নয়। তবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে—এই খবর মাত্র সপ্তাহখানেক আগে তিনি জেনেছেন আইনজীবীর মারফত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার খালা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগসাজশে প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার পূর্বাচলে তার মা, ভাই ও বোনের জন্য প্লট নিয়েছেন।
বরাবরের মতো ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছেন, এসব অভিযোগ ‘পুরোপুরি অবাস্তব’। আগামীকাল সোমবার (১১ই আগস্ট) ঢাকার আদালতে টিউলিপসহ আরও ২০ জনের বিরুদ্ধে এই মামলার শুনানি শুরু হবে। সশরীরে বা ভিডিও লিংকের মাধ্যমে তিনি এই শুনানিতে অংশ নেবেন কী না?
জবাবে টিউলিপ দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমি হোগো কিথ কেসির কাছ থেকে আইনি পরামর্শ নিচ্ছি। আমার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, সেটা তাদের পরামর্শের আলোকে নির্ধারণ করা হবে।’
তিনি বলেন, আদালতে হাজির হতে ‘আনুষ্ঠানিক সমন’ পাননি তিনি। তার ‘বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে’, তা তিনি ‘এখনো জানেন না’।
এই ব্রিটিশ এমপি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, আমি যেন এক চরম অস্বস্তিকর দুঃস্বপ্নে আটকে গেছি, যেখানে আমাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। অথচ আমি এখনো জানতে পারিনি, অভিযোগটা কী বা এই বিচার আসলে কী নিয়ে।’
বাংলাদেশের সরকার জানিয়েছে, প্রয়োজনে টিউলিপের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলবে। টিউলিপ দোষী সাব্যস্ত হলে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যে প্রত্যর্পণ ইস্যু সামনে আসবে। তবে ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এমন কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই।’
টিউলিপ যে দেশের নাগরিক, তার থেকে প্রায় ৫ হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন তার খালা শেখ হাসিনা। কিন্তু গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার শাসন ভেঙে পড়ে। টানা দেড় দশকের শাসনামলে ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে থাকা হাসিনা নির্মম প্রাণঘাতী উপায়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। যখন তার সরকারের পতন হয়, তখন তার সঙ্গে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন টিউলিপের মা শেখ রেহানা। পরে হাসিনা ও রেহানা—দুজনই ভারতে চলে যান।
টিউলিপ জানান, সেই সময়টা ছিল ঢাকায় অবস্থান করা তার পরিবারের সদস্যদের জন্য সত্যিকারের ভয়াবহ সময়। তবে ব্রিটেনে টিউলিপের স্বামী, দুই সন্তানের জীবন তাতে খুব একটা বাধাগ্রস্ত হয়নি। সবকিছুই ছিল তাদের জন্য স্বাভাবিক।
শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে টিউলিপ বলেন, ‘আমি এখানে আমার খালাকে রক্ষা করার জন্য আসিনি। আমি জানি, তার সরকারি দায়িত্ব কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, কীভাবে শেষ হয়েছে, তার প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত চলছে। আর আমি সত্যিই আশা করি, বাংলাদেশের মানুষ যে পরিসমাপ্তি চায়, তারা যেন তা পায়।’
শেখ হাসিনার পতনের পর তার এবং টিউলিপের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার তছরুপের অভিযোগ ওঠে। একটি ছবিকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগের পালে হাওয়া লাগে। ছবিটিতে দেখা যায়, শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে রাশিয়া সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বসে আছেন। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন হাস্যোজ্জ্বল টিউলিপ সিদ্দিক। তবে খালার সঙ্গে জড়িয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগকে তিনি ‘নোংরা রাজনীতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই ছবির বিষয়ে টিউলিপ বলেন, ‘আমার খালা রাশিয়ায় সরকারি সফরে গিয়েছিলেন। আমি ও আমার বোন লন্ডন থেকে রাশিয়ায় তার সঙ্গে দেখা করার জন্য যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নিইনি। আমরা ভ্রমণ করেছি, মজা করেছি, রেস্টুরেন্টে গেছি, শপিং করেছি। সফরের শেষ দিনে, সেখানে উপস্থিত সব রাজনীতিবিদের পরিবারের সদস্যদের চা পান ও এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে ছবিও তোলা হয়েছিল। আমি দুই মিনিটের জন্য পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম।’
তবে কেবল এই অভিযোগই নয়, টিউলিপের বিরুদ্ধে পরে কিংস ক্রসে ২০০৪ সালে একটি ফ্ল্যাট গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, এই ফ্ল্যাট হাসিনার দল আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির। টিউলিপ জানান, ফ্ল্যাটের আগের মালিক তার ‘ধর্মপিতা’ এবং তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবে এর আগে, টিউলিপ দুই বছর আগে একটি সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছিলেন, এই ফ্ল্যাট তাকে তার বাবা-মা কিনে উপহার দিয়েছিলেন।
এরপর প্রশ্ন ওঠে, টিউলিপ কেন ক্রিকলউডে থাকা নিজের বাড়ি রেখে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রোপার্টি ডেভেলপারের নামে থাকা একটি বাড়িতে বসবাস করছেন? এই বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ওই ব্যক্তিকে তিনি লেবার পার্টির মাধ্যমেই চিনেছিলেন। টিউলিপ জানান, তার নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। তাই তিনি নিজ বাড়ি ছেড়ে ওই বাড়িতে উঠেছিলেন।
টিউলিপ জানান, বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির এমপি ডেভিড অ্যামেস তার কর্মস্থলে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে তাকে স্থানান্তরিত হতে বলা হয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি সেই পরিচিত ব্যক্তির ওপর নির্ভর করেন। তিনি জানান, তিনি বাজার মূল্য অনুসারে ভাড়া দিয়েছেন। এবং এই বিষয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তিনি নিজে বিষয়টি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নৈতিকতাবিষয়ক উপদেষ্টা লরি ম্যাগনাসের কাছে উপস্থাপন করেন।
দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ‘ব্যাপক’ বৈঠক শেষে লরি ম্যাগনাস টিউলিপ সিদ্দিককে মন্ত্রিসভার আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন। তবে ম্যাগনাস যোগ করেন, ‘তিনি তার পারিবারিক সম্পর্ক এবং সরকারি ভূমিকার কারণে সম্ভাব্য মানহানির ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন না, এটি দুঃখজনক।’ তবে এই বিষয়ে টিউলিপ কিছুটা বিরক্ত। তিনি বলেন, ‘আমি তো আমার খালার পরে জন্মেছি, সেটা তো আমি বদলাতে পারি না। এটা অদ্ভুত কথা! যেন বলা হচ্ছে, তোমাকে তোমার জন্মের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত ছিল।’
খবরটি শেয়ার করুন