মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

দেশে বাড়ছে জঙ্গি তৎপরতার আশঙ্কা

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১২:৫৯ অপরাহ্ন, ২৬শে এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশ আবারও বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঝুঁকির মুখে—এমন আশঙ্কা ঘিরে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা তথ্য, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন সংস্থার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে জাতীয় সংসদ ভবন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা ও সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শাহবাগসহ আরও কয়েকটি স্পর্শকাতর স্থান।

সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতোমধ্যে একটি সতর্কতামূলক চিঠি পাঠানো হয়েছে দেশের সব ইউনিটে। ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, জঙ্গি সংগঠনের সমর্থকেরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার চেষ্টা করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিরাপত্তা জোরদার এবং নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত এক উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামি ওরফে আবু বক্কর ওরফে মোহাম্মদের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই ‘সেনা সদস্যের’ নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বোমা হামলা, দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে নাশকতা চালানো। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের যোগাযোগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ইতোমধ্যে সারাদেশে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দেড় হাজারের বেশি উগ্রবাদী সক্রিয় থাকতে পারে, যাদের মধ্যে অনেকেই কারাগার থেকে পলাতক।

গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে উচ্চ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এবং অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। এরপর থেকেই নিরাপত্তা জোরদারে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরে একাধিক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দেড় বছর ধরে দেশে উগ্রবাদী নেই, জঙ্গি নেই—এমন বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই ধারণার ফলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।”

গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্বল নীতিগত অবস্থানের সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে বড় সমাবেশ ও জনসমাগমকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে একাধিক প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

বর্তমানে দেশে ২০টির বেশি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), আল্লাহর দল, শাহাদাত-ই-আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) এবং হিযবুত তাহরীর নিষিদ্ধ। তবে গোয়েন্দারা বলছেন, নিষিদ্ধ হলেও এসব সংগঠন ছদ্মনামে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের কয়েকটি কারাগারে বিশৃঙ্খলার সুযোগে বহু বন্দি পালিয়ে যায়। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৯৮ জন রয়েছে, যাদের মধ্যে ৭৯ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অভিযোগ রয়েছে। এদের অনেকেই এখনও পলাতক এবং সাম্প্রতিক হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রভাবও বাড়ছে। লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার এক সন্দেহভাজন জঙ্গির জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই সংগঠনগুলো হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

টিটিপির সঙ্গে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো মাদারীপুরের ফয়সাল মোড়ল। দুবাই যাওয়ার কথা বলে তিনি পাকিস্তানে গিয়ে টিটিপিতে যোগ দেন এবং খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনা নতুন করে বাংলাদেশে টিটিপির কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ঢাকার জঙ্গিবিষয়ক কিছু সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে জনবল সংগ্রহের একটি প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামের এক ব্যক্তি এ কাজে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে, যিনি বাংলাদেশিদের উগ্রপন্থী সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন।

ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সারাদেশে জঙ্গি হামলার তথ্য পাওয়ার পর সিটিটিসি, সাইবার ইন্টেলিজেন্সসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।” আতঙ্কের বিষয়ে তিনি বলেন, “আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, আমরা কাজ করছি।”

তবে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বলেন, এটি গোপনীয় বিষয়। তার ভাষায়, “আমরা সিকিউরিটি প্ল্যানিং অনুযায়ী কাজ করছি, এখন মন্তব্য করার সময় আসেনি।”

এর আগে কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা জঙ্গিবিরোধী বিশ্লেষকদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের ঘটনার পেছনে থাকা সরঞ্জাম ও নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয় থাকতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর জিয়া উদ্যান থেকে আহসান জহির খান নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি অনলাইনে আইএসপন্থী উগ্রবাদী প্রচারণা চালাতেন, বোমা তৈরির তথ্য ছড়াতেন এবং শিয়া মসজিদ, পুলিশের চেকপোস্ট ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন এবং এমনকি এক কিশোরের যোগাযোগের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, “জঙ্গি হামলার তথ্য পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ সব দিকেই আমাদের সতর্ক নজরদারি রয়েছে।” তবে উগ্রপন্থীদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারেননি তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, সামনে জঙ্গি তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। তাদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

দেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস নতুন নয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে জেএমবি তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জঙ্গি তৎপরতা অনেকটা দমন করা সম্ভব হলেও, বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি কখনোই পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে তারা বলছেন, জঙ্গি সংগঠনগুলো আগের চেয়ে আরও কৌশলী হয়েছে। তারা সরাসরি সংগঠনের নামে না থেকে ছদ্মবেশে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এবং ছোট ছোট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী একদিকে আশ্বস্ত করছে, অন্যদিকে গোয়েন্দা তথ্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—জঙ্গিবাদ কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণে, নাকি আবারও বড় ধরনের কোনো হামলার আগে আমরা এক অদৃশ্য প্রস্তুতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি?

জঙ্গি তৎপরতা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250