শনিবার, ২৪শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৪০৭ বিদেশি, সাজা শেষে ফেরার অপেক্ষায় ১৭২ *** সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত, রিসোর্টের ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল *** দ্রুততম মানব ইমরানুর, মুকুট ধরে রাখলেন শিরিনও *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণে সহায়তা করেছিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকের স্ত্রী, গ্রেপ্তার *** কোনো কিছুই পক্ষে নেই, কেন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সৌদি যুবরাজ *** ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন’ জানিয়ে নওগাঁয় মাইকিং *** ছাত্রীকে যৌন হয়রানির খবরে মহিলা মাদ্রাসায় আগুন, শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসা শিক্ষক পলাতক *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নিপীড়ন: মাদ্রাসাশিক্ষককে থাপ্পড়ের ভিডিও ভাইরাল, থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ *** বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের আগে সুখবর দিল বিসিবি

দেশের ভেতরে মুখপাত্র ও নেতৃত্বের খোঁজে আওয়ামী লীগ

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০২:৫৩ পূর্বাহ্ন, ৭ই জুন ২০২৬

#

ফাইল ছবি

ঢাকায় ঝটিকা মিছিল হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়ছে। বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে আবারও নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। প্রায় দুই বছর আগে ক্ষমতা হারানোর পর যে দলটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল, সেই আওয়ামী লীগ এখন নতুন করে দেশের ভেতরে সাংগঠনিক উপস্থিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রশ্ন—দেশের ভেতরে তাদের মুখ কে?

দলটির একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, ভারতে অবস্থানরত সভাপতি শেখ হাসিনা এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন দেশের অভ্যন্তরে দৃশ্যমান নেতৃত্ব তৈরির ওপর। দীর্ঘদিন ধরে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে দল পরিচালনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা চলছে, দেশে অবস্থান করছেন এবং বর্তমানে কারাগারের বাইরে আছেন—এমন একজন গ্রহণযোগ্য নেতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখপাত্র বা রাজনৈতিক সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না।

দলটির একাধিক সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য নামের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। যদিও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দলটির ভেতরে এমন আলোচনা যে চলছে, তা একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা, যিনি বর্তমানে ইউরোপে অবস্থান করছেন, সুখবর ডটকমকে বলেন, “বিদেশ থেকে বক্তব্য দেওয়া আর দেশে রাজনীতি করা এক জিনিস নয়। নেতাকর্মীরা জানতে চান, ঢাকায় তাদের নেতা কে। গণমাধ্যমের সামনে দলের পক্ষে কথা বলবেন কে। এখন এই শূন্যতা স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।”

দলটির নেতারা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশও আত্মগোপনে চলে যান বা বিদেশে আশ্রয় নেন। ফলে জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কার্যত কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই পড়ে থাকেন। সেই পরিস্থিতির প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শেখ হাসিনা বিভিন্ন ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে নেতাকর্মীদের বলেছেন, দেশের ভেতরে যারা সাহস নিয়ে সংগঠনকে ধরে রাখবেন, তারাই ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে বিবেচিত হবেন। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা মনে করেন, এ বক্তব্যের মধ্যেই দেশের অভ্যন্তরে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ইঙ্গিত রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সংকট শুধু সাংগঠনিক নয়, রাজনৈতিকও। জুলাই আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং দীর্ঘ শাসনামলে ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’ প্রতিষ্ঠার সমালোচনা এখনও দলটির পিছু ছাড়েনি। এসব অভিযোগের কারণে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন সহজ হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসমক্ষে গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করা। দলটি এখনও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, অতীতের বিতর্কিত ঘটনাগুলো সম্পর্কে তাদের অবস্থান কী। একই সঙ্গে জনগণের কাছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক রূপরেখাও তুলে ধরতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকলে তার সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে একজন দৃশ্যমান মুখপাত্র দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মুখপাত্র শুধু গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন না; তিনি নেতাকর্মীদের জন্যও মনস্তাত্ত্বিক ভরসার জায়গা তৈরি করেন।

আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন এই উপলব্ধি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে, মুখপাত্র না থাকায় দলটি রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। বিএনপি, জামায়াত কিংবা নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বক্তব্য দ্রুত জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়লেও আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেক সময় স্পষ্টভাবে সামনে আসে না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর প্রচারই দলটির প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।

দলটির কয়েক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও দলীয় উপস্থিতি বেড়েছে। অনেক স্থানে দলীয় কার্যালয় পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগও দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব কার্যক্রমকে সংগঠন পুনরুজ্জীবনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছে। বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয় খুলে দেওয়া এবং নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দলটির নেতারা মনে করেন, এসব কর্মসূচি প্রমাণ করছে যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তবে তারা এটাও স্বীকার করেন যে ঝটিকা মিছিল বা ফেসবুকভিত্তিক প্রচারণা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক পুনরুত্থান সম্ভব নয়।

একজন সাবেক মন্ত্রী বলেন, “দলের একজন দায়িত্বশীল মুখপাত্র থাকলে প্রতিদিনের রাজনৈতিক ইস্যুতে অবস্থান জানানো যেত। নেতাকর্মীরাও বুঝতে পারতেন কেন্দ্র কী ভাবছে।”

আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র বলছে, সাবের হোসেন চৌধুরীর নাম আলোচনায় থাকার কারণ হলো তিনি তুলনামূলকভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত এবং দলীয় রাজনীতিতে তুলনামূলক কম বিতর্কিত। অন্যদিকে সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন এবং আওয়ামী লীগের ভেতরে সংস্কারপন্থী ভাবমূর্তি রয়েছে। শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম আলোচনায় এসেছে তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য অবস্থানের কারণে।

তবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করেন, মুখপাত্র নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দলের রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ কৌশল এবং অতীতের বিতর্ক নিয়ে স্পষ্ট বার্তা না দিলে জনসমর্থন পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।

শেখ হাসিনা নিজেও বিভিন্ন বক্তব্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়। তার ঘনিষ্ঠ নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুরোপুরি সমাপ্ত বলে মনে করার সুযোগ নেই। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একাধিকবার বড় ধাক্কা কাটিয়ে ফিরে এসেছে। তবে বর্তমান সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে তারা অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখে সমর্থকভিত্তি রক্ষার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে আত্মসমালোচনা, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নতুন রাজনৈতিক ভাষা গ্রহণের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। দ্বিতীয় পথটি কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি দৃশ্যমান নেতৃত্ব, যিনি দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। শেখ হাসিনা বিদেশে থাকলেও দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য দেশে একজন আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র বা দায়িত্বশীল নেতার প্রয়োজনীয়তা এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। কারণ দলটির নেতারাই স্বীকার করছেন, নেতৃত্বের এই শূন্যতা যত দীর্ঘ হবে, ততই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে দেশের অন্যতম প্রাচীন দলটি।

প্রায় ৭৭ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ বহু সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এবারকার সংকট শুধু ক্ষমতা হারানোর নয়; এটি নেতৃত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—তিনটি প্রশ্নের সম্মিলিত সংকট। সেই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতেই এখন দেশের ভেতরে নতুন মুখের সন্ধান করছে দেশে নিষিদ্ধ দলটি।

আওয়ামী লীগ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250