ছবি: সংগৃহীত
১৯৯১ সালের পর থেকে দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলোতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব গভীরভাবে বিস্তৃত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তার মতে, সাংবাদিকতা এখন আর কেবল পেশাগত অনুশীলনের জায়গা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, যা পেশার মৌলিক নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তিনি বলেন, 'আজ একপক্ষের শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হচ্ছে। অথচ, ২১ মাস পরও এর কোনো প্রমাণ হাজির করা যায়নি। অন্যপক্ষের সাংবাদিকেরা এ নিয়ে একটি কথাও বলছেন না। প্রতিবাদ না করলেও অন্তত প্রশ্ন তো করা যায়! এটাই বুঝি পক্ষপাতদুষ্টতা।'
মাহফুজ আনামের এই বক্তব্যে সাংবাদিক সমাজের ভেতরে অবস্থানগত বিভাজন এবং নীরবতার সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে, যা তার মতে পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সাংবাদিকতার রাজনীতিকরণ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, 'সাংবাদিকতা পেশাও রাজনীতিকরণের শিকার। চিকিৎসক ও শিক্ষকদের মতো সাংবাদিকরাও দলীয়ভাবে বিভক্ত। হয়তো এর শুরু আরও আগে, কিন্তু ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দল-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকেরা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সরকারি সব ধরনের সহায়তা, বিদেশে প্রেস উইংয়ে নিয়োগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পান।'
তার মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলে সাংবাদিকতার ভেতরে একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে পেশাগত যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, 'শেখ হাসিনার ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে আমরা বিএনপিপন্থী সাংবাদিক প্রায় দেখিইনি। এমনকি জাতীয় প্রেসক্লাবেও না। ঠিক যেমন এখন সেখানে আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিক দেখাই যায় না।' এই বক্তব্যে তিনি সাংবাদিক সমাজের ভেতরে পারস্পরিক অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক শিবিরভিত্তিক বিভাজনকে তুলে ধরেন, যা তার মতে সাংবাদিকতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তিনি আরও কঠোরভাবে বলেন, 'এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে থাকা সাংবাদিকরা বুঝতেই পারেননি বা বুঝেও উপেক্ষা করেছেন যে, রাজনৈতিক আনুগত্য তাদের মধ্যে এমন পক্ষপাত তৈরি করে যা পেশার মূল মূল্যবোধ, অর্থাৎ নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থী। এতে সাংবাদিকতার প্রতি জনগণের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এটা সাংবাদিকরা হয় বুঝতে পারেননি, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেছেন।'
মাহফুজ আনামের মতে, সাংবাদিকতার এই সংকট কেবল সংবাদমাধ্যমের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সমগ্র পেশাগত সংস্কৃতির একটি অংশ, যেখানে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পাচ্ছে।
গত ১ এপ্রিল ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণ ‘পলিটিসাইজেশন অব আওয়ার প্রফেশনস’ শিরোনামে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রায় স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তিনি বলেন, 'বিষয়টা নিয়ে আমরা সাধারণত খুব বেশি আলোচনা করি না। অনেকটা স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছি। সেটা হলো, আমাদের বিভিন্ন পেশার রাজনীতিকরণ। এই প্রবণতা আমাদের পেশাগত উৎকর্ষতা অর্জনে বাধা দিচ্ছে; মেধাবীদের বদলে মধ্যমদের জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। দক্ষতার জায়গা দখল করেছে আনুগত্য, মুক্ত চিন্তার জায়গা চাটুকারিতা, আত্মমর্যাদার পরিবর্তে এসেছে নির্লজ্জতা। আমরা সত্যনিষ্ঠ হওয়ার চেয়ে মাথা নোয়াতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছি।'
এই বক্তব্যে তিনি কেবল সাংবাদিকতা নয়, বরং সমগ্র পেশাজীবী সমাজের ভেতরে একটি মূল্যবোধগত অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। মাহফুজ আনামের মতে, পেশাজীবী সংগঠনগুলো এখন রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বিভক্ত। তিনি বলেন, 'আমাদের অধিকাংশ পেশাজীবী সংগঠন দলীয় আনুগত্যে বিভক্ত। পেশাদারিত্বের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বেশি। আর দলীয় আনুগত্যের আড়ালে এটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যে। যেমন: শীর্ষ পদ দখল বা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ।'
তার বিশ্লেষণে চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনজীবী, প্রকৌশলী ও সাংবাদিক—সবাই এই প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি আরও বলেন, 'আমাদের চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রকাশ্যেই পেশাদারত্বকে পেছনে ঠেলে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট পেশাগুলোর মান নেমে গেছে। আমাদের আধুনিকায়ন ও অগ্রগতিকে যে বিষয়গুলো বাধাগ্রস্ত করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো আমলাতন্ত্র, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো জনসেবা প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকরণ। এসব জায়গায় জনগণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যে মনোযোগ দৃশ্যমান।'
চিকিৎসা খাতকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, 'চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের মাধ্যমে এই পেশায় রাজনীতিকরণ শুরু হয়েছে কয়েক দশক আগে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থনে। কোনো দল ক্ষমতায় এলে তাদের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো কার্যত স্বাস্থ্যখাত পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও নতুন নিয়োগ, এমনকি তহবিল বণ্টন ও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব দেখা যায়।'
তার মতে, এখানে মেধার চেয়ে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতাই হয়ে উঠেছে মূল মানদণ্ড। তিনি বলেন, 'চিকিৎসক হিসেবে একজন কতটা সফল সেটা নয়, বরং এসব সংগঠনে তিনি কতটা ক্ষমতাবান সেটাই হয়ে ওঠে আসল মাপকাঠি। জনসেবা যার মৌলিক নীতি, সেই স্বাস্থ্যখাত কি এভাবে পরিচালিত হতে পারে? স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই খাতের দুরবস্থার দিকে তাকালেই তার উত্তর পাওয়া যায়।'
শিক্ষা খাত নিয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনীতিকরণ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, 'শিক্ষক, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণ আমাদের উচ্চশিক্ষাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিক্ষকদের আলাদা আলাদা প্যানেল রয়েছে। সাদা, নীল ও গোলাপি প্যানেল যথাক্রমে বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এগুলো শিক্ষকদের মধ্যে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।'
তার মতে, এই বিভাজনের ফলে একাডেমিক মূল্যায়নের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যই হয়ে উঠেছে নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রধান ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, 'দলীয় শিক্ষক গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে একই ধারার রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এমন এক লজ্জাজনক সমীকরণ তৈরি হয়, যা শালীনতা ও সৌজন্যের সব সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় দলীয় পরিচয়।'
তার মতে, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
মাহফুজ আনাম আরও বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। তিনি বলেন, 'এসব প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সম্ভবত রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে। তাদের অনেকেই হয়তো এ পদে নিয়োগের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতাও রাখতেন না। কিন্তু, নিজেদের অনুগত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে গোষ্ঠী তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের মতো পরিচালনা করেছেন। ফলে একাডেমিক পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারও উপাচার্য নিয়োগে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।'
সার্বিকভাবে মাহফুজ আনামের এই বিশ্লেষণ সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশাসন—সব পেশার ভেতরে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ও দলীয়করণের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে, যেখানে পেশাগত মান, নিরপেক্ষতা ও জনআস্থার সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
খবরটি শেয়ার করুন