রবিবার, ১৮ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ২০২৬ ব্যালন ডি’অরের আগে ইয়ামালকে ‘বিশ্বসেরা’ বললেন নেইমার *** অমর একুশে বইমেলা শুরু ৭ জানুয়ারি *** সাংবাদিক আলিফ হত্যার দ্রুত সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-স্বচ্ছ তদন্তের দাবি সম্পাদক পরিষদের *** শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন *** অস্ত্রকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, ইশরাক হারাতে পারেন প্রতিমন্ত্রীর পদ *** প্রধানমন্ত্রীর নীলফামারী সফর ঘিরে প্রস্তুতি *** লালনের তিরোধান দিবসে ময়মনসিংহে বাউল গানের আসর *** পিস্তল হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, ত্রাসের রাজত্বের ইঙ্গিত বলছে জামায়াত *** এবার তিউনিসিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন শুরু *** মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পরিস্থিতি জানতে চাইল সরকার

অস্ত্রকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, ইশরাক হারাতে পারেন প্রতিমন্ত্রীর পদ

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ০৭:২৯ অপরাহ্ন, ১৮ই অক্টোবর ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অংশ নেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন তিনি। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রীর পদ হারাতে পারেন ইশরাক। তাকে পদত্যাগও করতে হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের আপত্তি নেই। কিন্তু একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে অভিযান পরিচালনার ধরন সরকারের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের দায়িত্ব, জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা প্রয়োগ এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমন সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার দৃশ্য সরকারের ঘোষিত কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ঘটনাটিকে শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে না সরকার।

তবে ইশরাকের পদত্যাগ বা তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা পাওয়া যায়নি। সরকারের সূত্রগুলো সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা জানালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি।

গতকাল শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক। তিনি ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্যও। তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কয়েকজনকে ধাওয়া করছেন তিনি। একপর্যায়ে তাকে চিৎকার করে থামতে বলতেও শোনা যায়। তার সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তির হাতেও অস্ত্র দেখা যায়।

ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। একজন প্রতিমন্ত্রী কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো অভিযানে অংশ নিলেন, সেই প্রশ্ন ওঠে। মাদক কারবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও অনেকে অস্ত্র প্রদর্শনের ধরন নিয়ে আপত্তি জানান।

ঘটনার পরদিন আজ রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের এই পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের ভেতরেও ঘটনাটি নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্রগুলো। তাদের মতে, মাদক নির্মূলে সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগের পরিবর্তে এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শন। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কার হাতে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ঘটনার সময়টি নিয়েও সরকারের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা ও ফুটপাত পরিদর্শন করেন। পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক সেবা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে উন্নতি আনতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ শেষ করার সময়সীমাও বেঁধে দেন।

সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রধানমন্ত্রীর এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা ও জবাবদিহির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। একই দিনে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় সেই বার্তা আড়ালে চলে গেছে। সরকারের ইতিবাচক কর্মসূচির বদলে আলোচনায় এসেছে একজন মন্ত্রীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।

বিএনপির ভেতরেও এ ঘটনায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। দলের একাধিক পর্যায়ের নেতার মতে, মাদকের বিস্তার ঠেকানো জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের অংশ হলেও অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকলে প্রশাসনকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অস্ত্র হাতে নিয়ে নিজেই অভিযান পরিচালনা করলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে।

ইশরাক অবশ্য নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে আত্মরক্ষার যুক্তি দিয়েছেন। আজ দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, একটি অস্থায়ী মাদক আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তার নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত। স্থানীয় এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আগে থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে পুলিশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শনিবার ইশরাক নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন। অন্যদিকে ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে অভিযানের বিষয়ে জানাননি। পরে পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে।

এদিকে আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ কি না, তার পাশাপাশি প্রকাশ্যে সেটি প্রদর্শনের ধরন নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালায় অস্ত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্যের মধ্যে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। ইশরাকের ঘটনায় এ বিধানের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হতে পারে।

ইশরাক বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যও। ফলে তার অস্ত্র হাতে অভিযানের ছবি ও ভিডিও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে সরকারের ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। মন্ত্রিসভার সদস্যের এমন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক পরিসরে সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে তারা।

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইশরাকের সমালোচনা চলছে। কেউ কেউ তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও তুলেছেন। তবে ইশরাক নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মাদক কারবারে নিজের দলের কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্রগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, এখন প্রশ্নটি শুধু মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ, প্রশাসনের কর্তৃত্ব এবং সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ঘটনায় কঠোর অবস্থানে রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে ইশরাকের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। পদত্যাগে বাধ্য করা হবে, নাকি তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। পুলিশি তদন্তের ফলও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের উপস্থিতি এখন তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্রগুলোর ভাষ্য, ঘটনাটিকে হালকাভাবে দেখছে না সরকার। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করতে পারে ইশরাকের মন্ত্রিত্বের ভবিষ্যৎ।

ইশরাক হোসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250