ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ঘোষিত ৩৬ প্রার্থীর তালিকায় ফাহমিদা হকের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী হওয়ায় এই মনোনয়নকে অনেকে ‘চমক’ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ তুলছেন জিল্লুর রহমানের সাংবাদিকতার, বা পেশাগত 'নিরপেক্ষতা' নিয়ে প্রশ্ন।
বিএনপি গতকাল সোমবার (২০ এপ্রিল) সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে ফাহমিদা হকের নাম দেখার পর থেকেই নানা প্রশ্ন সামনে আসতে শুরু করে। তিনি সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে কতটা যুক্ত ছিলেন, কিংবা তার রাজনৈতিক পরিচিতি কতটা প্রতিষ্ঠিত—এসব বিষয় নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি তার স্বামী জিল্লুর রহমানের পেশাগত অবস্থান নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।
ফাহমিদার মনোনয়ন ঘিরে নতুন বিতর্কের পাশাপাশি পুরোনো কিছু ঘটনাও আবার আলোচনায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম ২০২৩ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা—বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জিল্লুর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠিত গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) ব্যাংক হিসাব তলবের ঘটনা।
সে সময় বিএফআইইউ চিঠিতে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে জিল্লুর রহমান ও সিজিএসের ব্যাংক হিসাব, কার্ডে জমা ও উত্তোলনসহ সব ধরনের তথ্য চাওয়া হয়। বিদেশ থেকে অর্থ লেনদেনের তথ্যও জানতে চাওয়া হয়েছিল। যদিও বিষয়টি পরবর্তীতে আর এগোয়নি, তবু সেই সময় সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জিল্লুর রহমান কেন নিজেই তথ্য প্রকাশ করেননি।
এর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আরেকটি ঘটনা আলোচনায় আসে। সে সময় গভীর রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জিল্লুর রহমান অভিযোগ করেন, শরীয়তপুরে তার পৈতৃক বাড়িতে তথ্য সংগ্রহে গিয়েছিল পুলিশ। তিনি লিখেছিলেন, “কোনো তথ্য দরকার হলে পুলিশ সদস্যরা সরাসরি আমার কাছে যেতে পারতেন বা আমাকে টেলিফোন করতে পারতেন। তারপরও তারা আমার পৈতৃক বাড়িতে গেছেন… আমাকে, আমার পরিবার ও প্রতিবেশীদের ভয় দেখানোর জন্য এটা করা হয়েছে।”
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তখন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। শরীয়তপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. সাইফুল হক গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, এটি ছিল বিট পুলিশিংয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। সেখানে বলা হয়, “পুলিশ সদস্যরা ওই বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন বাড়ির মালিক জিল্লুর রহমান… তারা কেয়ারটেকার ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে দুই-তিন মিনিটের মধ্যে চলে যান।” পুলিশ দাবি করে, কাউকে ভয় দেখানোর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
ফাহমিদা হকের মনোনয়নের পর এই পুরোনো ঘটনাগুলো আবার সামনে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন। মূল প্রশ্নটি এখন দাঁড়িয়েছে—একজন প্রভাবশালী টকশো উপস্থাপকের স্ত্রী যদি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য হন, তাহলে সেই সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা কতটা বজায় থাকে?
ফেসবুক ব্যবহারকারী রাশেদ মাহমুদ লিখেছেন, “একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার নিরপেক্ষতা। কিন্তু তার স্ত্রী যদি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তাহলে দর্শক হিসেবে আমাদের মনে সন্দেহ আসাটা স্বাভাবিক।”
আরেকজন, সুমাইয়া তাসনিম মন্তব্য করেন, “জিল্লুর রহমান বরাবরই নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন?”
তবে সবাই যে সমালোচনামুখর, তা নয়। কেউ কেউ এটিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেও দেখছেন। মাহবুব আলম নামের এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “স্ত্রী রাজনীতি করবেন, স্বামী সাংবাদিকতা করবেন—এটা অসম্ভব কিছু না। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন আলাদা রাখা সম্ভব।”
চলমান বিতর্কের মধ্যে আজ মঙ্গলবার নিজেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিল্লুর রহমান। তিনি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, অনেকেই তার অবস্থান জানতে চাওয়ায় তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করতে চান।
ফাহমিদা হকের মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ফাহমিদার জনসম্পৃক্ততা আজকের বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি লেখালেখি, সামাজিক উদ্যোগ এবং নীতিনির্ধারণসংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত আছেন। তিনি দেশজুড়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন… এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তার রাজনীতি ও জনজীবনের প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই দীর্ঘ সামাজিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতায়ই ফাহমিদা সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন।
নিজের পেশাগত অবস্থান প্রসঙ্গে জিল্লুর রহমান বলেন, “আমার পেশাগত জীবন—একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট, টক শো উপস্থাপক এবং একটি নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশকের স্বাধীন পেশাগত কাজের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সেই পেশাগত দায়িত্ব ও অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।”
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা শুধু বাস্তব আচরণের ওপর নির্ভর করে না, বরং দর্শক বা পাঠকের ধারণাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, একজন সাংবাদিক বাস্তবে নিরপেক্ষ থাকলেও যদি তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা পারিবারিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেই নিরপেক্ষতা জনমনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, “সংবাদ উপস্থাপনায় বিশ্বাসযোগ্যতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে আসে। যদিও আইনগতভাবে কোনো বাধা নেই, কিন্তু নৈতিক প্রশ্নটি থেকেই যায়।” তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়, বিশেষ করে রাজনৈতিক আলোচনায় ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে।
ফাহমিদা হকের সংসদ সদস্য হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এর প্রভাব শুধু তার রাজনৈতিক জীবনে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি তার স্বামী জিল্লুর রহমানের পেশাগত অবস্থান ও জনমতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, ‘তৃতীয় মাত্রা’র মতো প্রভাবশালী টকশোর উপস্থাপক হিসেবে জিল্লুর রহমান কীভাবে তার নিরপেক্ষতার অবস্থান ধরে রাখেন, এবং দর্শকেরা তা কতটা গ্রহণ করেন।
একদিকে রয়েছে তার নিজের দৃঢ় অবস্থান—“পেশাগত অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে”—অন্যদিকে রয়েছে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানই হয়তো নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বিতর্কের দিক।
প্রসঙ্গত, জিল্লুর রহমানের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার জুসিরগাঁও গ্রামে। ফাহমিদা হকের বাড়ি নরসিংদীর বেলাবো উপজেলায়।
খবরটি শেয়ার করুন