ফাইল ছবি
বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুইমাস পার হলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকে এখনো প্রকাশ্যে আসছেন না। আগের সরকারের আমলের তুলনায় এখন দেশের আইনশৃংখলা পরিস্থতি ভালো হলেও ‘মবের ভয়ে’ সাবেক সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা, উপদেষ্টারা সামাজিক ও বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠান, টিভি চ্যানেলের টকশোকে এড়িয়ে চলছেন। অনেকে ইতোমধ্যে নিরাপদ ঠিকানা ভেবে এবং জবাবদিহি ও গ্রেপ্তার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভয়াবহভাবে বিস্তার ঘটা ‘মবের আতঙ্ক’ এখনো উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেককে তাড়া করে। এই পরিস্থিতি তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ফলে জনসম্মুখে আসা বা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তারা সতর্কতা অবলম্বন করছেন। আঠারো মাস দায়িত্ব পালন করা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা এখন কে কোথায় আছেন এবং কী করছেন—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে অনেক উপদেষ্টা অবস্থান ও কর্মজীবন নিয়ে তথ্য প্রকাশ করছেন না।
সাবেক অন্তত আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সরকারে থাকাকালে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। গ্রেপ্তারের ভয়েও সাবেক সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কেউ কেউ গা ঢাকা দিয়েছেন। এই অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা গুঞ্জন ও জল্পনার জন্ম দিচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। তারেক রহমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপর সাবেক উপদেষ্টারা আগের পেশা ও কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবেন বলে গণমাধ্যমকে জানান। ইতোমধ্যে তারা সরকারি বাসভবন, বাংলো বা অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিলেও আছেন লোকচক্ষুর আড়ালে।
তারেক রহমানের সরকারের শপথ নেওয়ার আগেই সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দেশ ছাড়েন। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথের রাতে সিঙ্গাপুরে চলে যান প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা ছাড়েন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আলী রীয়াজও। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও বিদেশে আছেন।
দেশত্যাগের এসব ঘটনা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে সমালোচনা চলমান। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস যোগ দিয়েছেন ইউনূস সেন্টারে। তার সরকারের আলোচিত-সমালোচিত উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ৩৫ হেয়ার রোডের সরকারি বাসা ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের পুরোনো বাসায় উঠেছেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশীদের কোনো তথ্যই জানাতে পারেননি তার ঘনিষ্ঠজনেরা। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারকে গত দুই মাসের মধ্যে একবারের জন্যও প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যায়নি।
সাবেক উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দায়িত্ব পালনকালে সরকারি বাসার সুবিধা নেননি; তারা ঢাকায় নিজ বাসাতেই ছিলেন। তবে তারাও এখন জনসম্মুখে খুব একটা সক্রিয় নন এবং ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ রাখছেন। গণমাধ্যমকে তারা এড়িয়ে চলছেন বলে জানা গেছে। তাদের এই নীরবতা ও আড়ালে থাকা জনমনে রহস্য তৈরি করেছে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও কৌতূহল বাড়িয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এম সাখাওয়াত হোসেনকে গণমাধ্যমে দেখা গেলেও তিনি দুর্নীতি ও এক এগারোর ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হতে পারেন। এ কারণে তার চলাফেরা ও বক্তব্যে সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ড. ইউনূস সরকারে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করার পর তার স্থলে দায়িত্বে আসেন মাহফুজ আলম। গত ১০ ডিসেম্বর তিনি তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকাতে অবস্থান করছেন, কোনো কাজে যোগ দেননি। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। গত ১০ ডিসেম্বর বিতর্কিত এই উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকাতে অবস্থান করে এনসিপির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন। রাজনীতিতে তার সক্রিয়তা অন্যদের তুলনায় কিছুটা দৃশ্যমান।
সরকার পরিবর্তনের পর সাবেক উপদেষ্টাদের অবস্থান নিয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে—দু-একজন ছাড়া সবাই দেশে আছেন। তবে অধিকাংশই গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। সাবেক সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। দায়িত্বের মেয়াদ শেষে তিনি নতুন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার এই পরিবর্তনকে অনেকে পেশাগত ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে তার মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। এই পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর থেকে সাবেক সরকারের খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায়ের অবস্থান ও কর্মজীবন নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। দায়িত্ব পালন শেষে তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান কর্মজীবন নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আড়ালে থাকলেও এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ফাওজুল কবিরের জড়িত থাকার অভিযোগ আবার সামনে আসছে।
সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে দুদক কার্যালয়ে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, দুদক অন্য সব অভিযোগ যেভাবে যাচাই করে, এসব অভিযোগও একইভাবে যাচাই করা হবে। মুহাম্মদ ইউনূসসহ আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ও নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
দুদকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেছেন একজন। দুদকের সূত্র বলছে, ‘এসব অভিযোগ তারা যাচাইবাছাই করছে। যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে। তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলেও তা চলমান রয়েছে।’ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত হয় ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। শুরুতে ১৬ উপদেষ্টা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরে যুক্ত হন আরও কয়েক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী। দেড় বছর পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। এই পুরো সময়টি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন