ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মন্ত্রী ও দলটির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর তিনি আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং স্বাধীনভাবে এমন কোনো উদ্যোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার পর দলটির সাংগঠনিক অবস্থান, নেতৃত্বের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সুখবর ডটকমের পক্ষ থেকে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং পুরোনো নেতাদের পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, অতীতে নানা কারণে দল থেকে দূরে সরে যাওয়া বা বহিষ্কৃত হওয়া কিছু নেতার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দলকে ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে হতে পারে। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর নাম নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো নেতা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কয়েকজন নেতা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলকে নতুন কৌশল নিতে হতে পারে। তবে লতিফ সিদ্দিকীকে দলে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের কথা তারা জানেন না।
আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, দলটিকে এখন ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এজন্য দল থেকে অতীতে বিভিন্ন সময় বহিষ্কার হওয়া নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিদেশে বসে দলটির শীর্ষ কয়েক নেতা অতীতে দল থেকে বহিষ্কৃতদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ ধারাবাহিকতায় লতিফ সিদ্দিকীর কাছেও দলে ফেরার প্রস্তাব গেছে।
যোগাযোগ করলে বিষয়টি নিয়ে সুখবর ডটকমের কাছে মন্তব্য করতে রাজি হননি লতিফ সিদ্দিকী। বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় এখনো আসেনি।’ আওয়ামী লীগৈর একাধিক নেতা আভাস দিয়েছেন, দলে ফিরলেও এই মুহুূর্তে অনেকেই তা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকাশ্যে ঘোষণা না-ও দিতে পারেন। কারণ, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন এবং দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। আওয়ামী লীগ সরকারে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
তবে ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ, তাবলিগ জামাত এবং কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে করা মন্তব্যের জেরে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। সেই বক্তব্য দেশে ‘তীব্র প্রতিক্রিয়ার’ সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগ প্রথমে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করে এবং পরে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করে।
একই বছরের ২৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তাকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়। বৈঠক শেষে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হয়নি। তার ভাষ্য ছিল, লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ করেছে এবং দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষকে ‘মর্মাহত’ করেছে।
দলীয় সূত্রে সে সময় জানা গিয়েছিল, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে লতিফ সিদ্দিকী নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেননি। বরং তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছিলেন এবং দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, মন্ত্রিত্ব বা পদ হারানো তাকে বিচলিত করেনি, তবে যে দলের আদর্শ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন, সেই দল থেকে বহিষ্কার হওয়া তার জন্য বেদনাদায়ক হবে।
চূড়ান্ত বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের সময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকেই তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। বৈঠকের আলোচনায় তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, বিভিন্ন সময়ে দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে মতপার্থক্য এবং বিতর্কিত বক্তব্যের প্রসঙ্গও উঠে আসে। বৈঠকে বিভিন্ন সময় লতিফ সিদ্দিকী কীভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সৈয়দ আশরাফ তার বক্তব্যে তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর লতিফ সিদ্দিকী খোন্দকার মোশতাকের পক্ষে বিবৃতি দেন। আওয়ামী লীগ বিভক্ত হলে লতিফ সিদ্দিকী শেখ হাসিনাকে ছেড়ে অন্য পক্ষে যান। ১৯৮৬ সালে এরশাদের আনা সপ্তম সংশোধনীতে লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রী ভোট দেন। এরপরও বিভিন্ন সময়ের অবদান বিবেচনা করে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয় তাকে।
বহিষ্কারের পর তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়। পরে দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং কারাগারেও যেতে হয়। সেই সময় তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও তিনি আর আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও তিনি আলোচনায় ছিলেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লতিফ সিদ্দিকীর প্রশ্নটি কেবল একজন নেতার দলে ফেরা না-ফেরার বিষয় নয়; বরং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কৌশলের সঙ্গেও এটি যুক্ত। যদি দলটি সত্যিই অতীতে বহিষ্কৃত বা দূরে সরে যাওয়া নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাহলে তা দলীয় পুনর্গঠনের একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আবার অন্য বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং অতীতের সিদ্ধান্তের কারণে এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী একটি আলোচিত নাম। তিনি যেমন দীর্ঘ সময় দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি তার বহিষ্কারও ছিল দলটির ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ফলে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহ তৈরি করলেও বিষয়টি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
দলীয় সূত্র, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় তার নাম নতুন করে উঠে এলেও আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা লতিফ সিদ্দিকীর নিজস্ব অবস্থান প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে রাজনৈতিক গুঞ্জন হিসেবেই দেখছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। তাদের মতে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলীয় সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পর্কের নতুন কোনো অধ্যায় শুরু হবে কি না।
খবরটি শেয়ার করুন