মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে কী বলছে আন্তর্জাতিক সংগঠন?

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ১১:০০ অপরাহ্ন, ২রা মে ২০২৬

#

কারাবন্দী সাংবাদিক। ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) সর্বশেষ মূল্যায়ন। ২০২৬ বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে দেশের অবস্থান তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম হওয়া কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সামগ্রিক অবস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৩৩.০৫ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ এখনও “অত্যন্ত গুরুতর” শ্রেণির মধ্যে অবস্থান করছে, যা দেখায় যে অল্প কিছু অগ্রগতি হলেও তা কাঠামোগতভাবে স্থায়ী হয়নি।

এই সূচকটি মূলত ২০২৫ সালের বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যখন দেশে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস চলছিল। ফলে এই অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গেলে কেবল সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনি কাঠামো এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হয়।

আগের বছরগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের স্কোরে সামান্য ওঠানামা থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখানে এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স।

আরএসএফ যে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে—রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং নিরাপত্তা—বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষ করে আইনগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। এর অর্থ হচ্ছে, সমস্যাটি কেবল সরকার বা রাজনৈতিক চাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট, যেখানে আইনের প্রয়োগ, বাজার কাঠামো এবং সামাজিক বাস্তবতা একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও গভীর। গত ২৫ বছরের মধ্যে এবারই বৈশ্বিকভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে আরএসএফ উল্লেখ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ “কঠিন” বা “অত্যন্ত গুরুতর” অবস্থায় রয়েছে।

এই প্রবণতা দেখায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন আর কেবল কিছু স্বৈরশাসিত দেশের সমস্যা নয়; বরং এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে বিশেষভাবে দমনমূলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে আইনগত স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়মিতভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে মাঝামাঝি। পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুবই সামান্য। অন্যদিকে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা দেখায় যে একই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার থাকলে উন্নতি সম্ভব।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় প্রবেশ করলে দেখা যায়, তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি বড় বৈষম্য বিদ্যমান। দেশের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, ফলে মূলধারার গণমাধ্যমে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত। এর ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের স্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকেও প্রভাবিত করে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমালেও সেখানে নতুন ধরনের ঝুঁকি—ভুয়া তথ্য, অনলাইন হয়রানি এবং নজরদারি—যোগ হয়েছে।

গণমাধ্যমের কাঠামোগত দিক থেকেও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলো কার্যত সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, ফলে সেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ। বেসরকারি খাতে বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম থাকলেও মালিকানা কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।

মিডিয়া মালিকদের একটি অংশ ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু এখন তা আরও দৃশ্যমান।

আইনগত কাঠামো এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। সাইবার সিকিউরিটি আইনসহ বিভিন্ন বিধান সাংবাদিকদের জন্য একটি অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে। ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা ভাঙার সুযোগ সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপে ঠেলে দেয়।

রাজনৈতিক ইতিহাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার গণমাধ্যমকে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কে অনেক বিশ্লেষক “নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের যুগ” হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে সেন্সরশিপ, অনলাইন হয়রানি এবং বিচারিক চাপ সাংবাদিকদের কাজকে সীমিত করে দেয়।

এই ধারাবাহিকতার ফলে গণমাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সহজে দূর হয় না।

নিরাপত্তার বিষয়টিও সমানভাবে উদ্বেগজনক। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি দ্বিগুণ, কারণ তারা পেশাগত বাধার পাশাপাশি সামাজিক ও অনলাইন হয়রানির মুখোমুখি হন।

অর্থনৈতিক দিক থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই অবহেলিত বিষয়। দেশের বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত, যারা অনেক সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেন।

সরকারি বিজ্ঞাপন এবং আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর নির্ভরতা গণমাধ্যমকে আরও প্রভাবাধীন করে তোলে। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের ভাষায়, অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য হয়, যা সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইনি সংস্কারই যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজন। মিডিয়া গবেষকরা বলছেন, প্রথমত আইনগত কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, যাতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত না হয়।

দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক প্রভাব কমে। তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে হামলা ও হয়রানির বিচার হয়।

ডিজিটাল যুগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার যদি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তবে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে; আবার নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থাও ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঘটাতে পারে। তাই এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক সূচকের অবনতি কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়; এটি একটি সুযোগও—যেখানে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক সচেতনতা—যা একসঙ্গে কাজ করলে তবেই গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250