মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

বজ্রপাতে দরিদ্র মানুষেরা কেন বেশি মারা যায়

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৮:০৮ অপরাহ্ন, ২৭শে এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাত এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্যোগ নয়; বরং এক ধরনের নিয়মিত, মৌসুমি এবং পূর্বানুমানযোগ্য প্রাণঘাতী বিপদে পরিণত হয়েছে। গতকাল রোববার সাতটি জেলায় বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু আবারও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। চলতি বছরে একদিনে এটিই সর্বোচ্চ প্রাণহানি। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

দেশে বজ্রপাত এখন একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মার্চ থেকে এর ঝুঁকি বাড়তে থাকে, এপ্রিল মাসে তা তীব্র হয় এবং মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। জুন ও জুলাইয়ে কিছুটা কমলেও পুরোপুরি শেষ হয় না, আর সেপ্টেম্বরেও আবার সামান্য বাড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুলাই সময়কালেই বজ্রঝলকের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়টিই আবার দেশের কৃষি ও গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।

গত ১৫ বছরের তথ্য বলছে, বড় ধরনের বজ্রপাতজনিত প্রাণহানির অধিকাংশই এপ্রিল, মে ও জুন মাসে ঘটেছে। ২০১১ সালের মে মাসে এক দিনে ৫৮ জনের মৃত্যু, ২০১৬ সালে দুই দিনে ৮৭ জনের প্রাণহানি কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০ থেকে ৩০ জনের একাধিক ঘটনা—সবই একই মৌসুমি প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ সমস্যা অপ্রত্যাশিত নয়, বরং অত্যন্ত পূর্বানুমানযোগ্য।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই পূর্বানুমানযোগ্যতার পরও কেন মৃত্যু কমছে না, এবং কেন এই মৃত্যুর ভার সবচেয়ে বেশি বইছেন দরিদ্র মানুষ?

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারার মতে, বজ্রপাতে যারা মারা যান তারা মূলত সমাজের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশ। এই বাস্তবতা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত সত্য নয়, বরং একটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। 

তার ভাষায়, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আলোচনা হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ বা স্থায়ী প্রস্তুতির উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল থেকে যায়, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক নয়।

এই প্রতিক্রিয়াশীলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে দরিদ্র মানুষের ঝুঁকির মূল কারণ। কারণ, বজ্রপাতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল প্রাকৃতিক নয়; এটি জীবিকা, স্থান ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশে বজ্রপাতে নিহতদের মধ্যে একটি বড় অংশ কৃষক। এছাড়া জেলে, দিনমজুর, গৃহিণী এবং শিক্ষার্থীরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছেন।

এই পেশাগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—এরা সবাই খোলা পরিবেশে কাজ করেন বা চলাচল করেন। কৃষক মাঠে, জেলে নদীতে, আর দিনমজুর নির্মাণ বা খোলা স্থানে কাজ করেন। বজ্রপাতের সময় এই খোলা পরিবেশই তাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, জলাশয়ের নিকটবর্তী এলাকায় বজ্রপাত বেশি ঘটে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু এবং স্থানীয় জলাভূমির বাষ্প একত্র হয়ে যে মেঘ তৈরি করে, তা বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ফলে হাওর অঞ্চল, নদীসংলগ্ন এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠে থাকা মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

ভৌগোলিক এই ঝুঁকি আবার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলে গিয়ে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়ায়। কারণ, উন্নত বা শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় সহজলভ্য নয়। অনেক এলাকায় বজ্রনিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নেই, থাকলেও দূরত্ব বা সচেতনতার অভাবে তা ব্যবহার করা হয় না। ফলে ঝড় শুরু হলে মানুষ খোলা মাঠেই আটকে পড়েন।

আরেকটি বড় কারণ হলো আচরণগত ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা। ঝড় শুরু হলেও অনেক কৃষক ফসল কাটা, গবাদিপশু আনা বা সেচযন্ত্র সরানোর কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন। একজন দিনমজুরের ক্ষেত্রে কাজ থামানো মানেই দিনের আয়ের ক্ষতি। ফলে তারা ঝুঁকি জেনেও কাজ চালিয়ে যান। এই অর্থনৈতিক চাপই অনেক সময় প্রাণঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

এই বাস্তবতা আরও জটিল হয় সচেতনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতায়। যদিও সরকারের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু তা এখনো সর্বজনীন নয়। অনেক গ্রামীণ মানুষ এখনো মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল সতর্কবার্তার বাইরে। ফলে ঝুঁকির তথ্য পেলেও তা বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা সবসময় সম্ভব হয় না।

পরিবেশগত পরিবর্তনও এই ঝুঁকি বাড়িয়েছে। অতীতে গ্রামীণ এলাকায় বড় গাছপালা বজ্রপাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিত। বড় গাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করে। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কাটা এবং কৃষিজমির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষা অনেকটাই কমে গেছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বড় গাছের ঘাটতি এখন স্পষ্ট। বড় গাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনা ও গাছ সংরক্ষণের অভাবে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সরকার ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর তালগাছ রোপণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন দুর্বল, আবার কোথাও মানুষের অংশগ্রহণও কম।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৪২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা ২০২৫ সালে কমে ১৭৩ জনে নেমে আসে। তবে এই হ্রাসকে স্থায়ী উন্নতি হিসেবে দেখা কঠিন। কারণ বজ্রপাতের প্রকৃত ঘনত্ব কমেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং বিদ্যুৎ ঝলকের সংখ্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ ঝুঁকি রয়ে গেছে, শুধু প্রাণহানির হার সাময়িকভাবে ওঠানামা করছে। এই পুরো বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—কেন দরিদ্র মানুষই বেশি মারা যায়?

এর উত্তর একক কোনো কারণে নয়, বরং কয়েকটি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথমত, তারা বেশি সময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব রয়েছে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ তাদের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। চতুর্থত, প্রযুক্তিগত ও তথ্যগত ব্যবধান তাদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে। এবং পঞ্চমত, পরিবেশগত পরিবর্তন তাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমিয়ে দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সচেতনতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা, স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয়, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় ঝুঁকি বিষয়ক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে, কারণ তারাই সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক কাঠামো।

সবশেষে বলা যায়, বজ্রপাত এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। কারণ, প্রকৃতির এই আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ছে সেই মানুষগুলোর ওপর, যাদের কাছে নিরাপত্তা, বিকল্প ও সুরক্ষার সুযোগ সবচেয়ে কম। আর এই কারণেই বজ্রপাতের সময় দরিদ্র মানুষের মৃত্যুর হার বেশি—এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন।

বজ্রপাত

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250