মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

পুলিশ কি ‘নিবন্ধনহীন নিউজ পোর্টাল বন্ধের নির্দেশনা’ দিতে পারে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, ৩০শে এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। অন্যথায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

তবে এসএমপি কমিশনারের এই নির্দেশনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার মুখে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই জারি করা গণবিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আরেকটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা প্রত্যাহার করেন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী। আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগের গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে নেয় এসএমপি।

এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু নিউজ পোর্টাল যথাযথ রেজিস্ট্রেশন ব্যতীত ভুল, অসত্য, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মানহানিকর এবং সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও প্রপাগান্ডাভিত্তিক সংবাদ প্রচার করছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ অবস্থায় এই গণবিজ্ঞপ্তি জারির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে (১ মে ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টা) রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল দেশি ও বিদেশি ডোমেইন থেকে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উক্ত ধরনের নিউজ পোর্টালের প্রকাশিত কোনো সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ, শেয়ার, লাইক ও কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকার জন্য সিলেট মহানগরীর সর্বসাধারণকে অনুরোধ করা হলো।

পুলিশের ওই গণবিজ্ঞপ্তি জারির পরপরই এর বৈধতা ও এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা শুরু হয়। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউবভিত্তিক আলোচনায় বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটিকে ‘অভূতপূর্ব’ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেন।

সমালোচকদের অনেকের মতে, অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন বা বন্ধ করার এখতিয়ার তথ্য মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছাড়া এমন বিজ্ঞপ্তি জারি করা পুলিশের এখতিয়ারবহির্ভূত।

সমালোচকরা বলেন, গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পর্ক সবসময়ই স্পর্শকাতর। একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বতন্ত্র ভূমিকা; এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ। এসএমপির বিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার সামনে আসে, পুলিশ কি সংবাদমাধ্যমকে নির্দেশ দিতে পারে?

পুলিশের ওই বিজ্ঞপ্তিকে বেআইনি ও বলপ্রয়োগের অপচেষ্টা দাবি করে সমালোচকরা বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে পুলিশের সরাসরি নির্দেশ বা হস্তক্ষেপের সুযোগ খুবই সীমিত। আইন অনুযায়ী, সংবাদপত্রের কাজ যেমন পুলিশিং করা নয়, তেমনি পুলিশের কাজও সাংবাদিকতা করা নয়।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীরাও এ বিষয়ে মত প্রকাশ করেন। ঢাকার বাসিন্দা রাশেদ মাহমুদ নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, “ভুয়া খবর অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত, কিন্তু সেটা করার দায়িত্ব পুলিশের না। এটা করলে ভবিষ্যতে আরও বড় অপব্যবহারের পথ খুলে যাবে।” আরেকজন ব্যবহারকারী, চট্টগ্রামের নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “আজ যদি নিবন্ধনবিহীন পোর্টাল বন্ধের নির্দেশ দেয়, কাল হয়তো নিবন্ধিত পোর্টাল নিয়েও নির্দেশ দিতে পারে—এটা উদ্বেগজনক।”

সাংবাদিকদের মতে, এই ধরনের নির্দেশনা শুধু আইনি প্রশ্নই তোলে না, বরং সাংবাদিকদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ কমিশনার এই গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। সিলেট মহানগর পুলিশের আইন অনুযায়ী গণবিজ্ঞপ্তি দিতে পারেন।

মহানগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা নয়। এটি ২০২১ সালের হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা। অনলাইনের নিবন্ধন বাতিল তথ্য মন্ত্রণালয় করবে। আমাদের যেখানে ভূমিকা নেওয়ার কথা, সেটি আমরা নিয়েছি।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্ট কোনো নীতিগত নির্দেশনা দিতে পারেন, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। পুলিশ সরাসরি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নামলে সেটি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকি তৈরি করে।

যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগে ভুয়া তথ্য একটি বড় সমস্যা—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমাধান হতে হবে স্বচ্ছ, আইনি কাঠামোর মধ্যে এবং অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে। হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা বা বন্ধের নির্দেশ দিলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

তবে পরবর্তীতে ১২ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যেই এই গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করা হয়। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে এসএমপি কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত আরেকটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পূর্বের গণবিজ্ঞপ্তি (সিটিএসবি/এসএমপি/২৫০১) বাতিল করা হয়েছে।

এই দ্রুত প্রত্যাহারকে অনেকেই ‘সমালোচনার প্রভাব’ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে জনমত এবং গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এখনো নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন—এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও সতর্কতা ও আইনি পর্যালোচনার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা অটুট থাকে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও সুরক্ষিত থাকে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250