ফাইল ছবি
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক, আইনি ও প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করেছে সরকার। তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার তথ্য-প্রমাণ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আদালতের আদেশ এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব নথি প্রস্তুত করে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আজ সোমবার সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠাতে হলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আরবি ভাষায় অনুবাদ করে যথাযথ স্বাক্ষর ও সিলমোহরসহ জমা দিতে হয়। এই বিধান অনুসরণ করেই বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতি, অর্থপাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার নথি অনুবাদের কাজ শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখায় আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘এনসিবি আবুধাবি’। ওই চিঠিতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনজীবীরা বলছেন, বিদেশে অবস্থানরত কোনো পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ করাই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের সমর্থনে নির্ভুল, গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। বিশেষ করে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত মামলায় সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে গতকাল রোববার রাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ সদর দপ্তর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলপত্র, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সেগুলো দ্রুত অনুবাদের বিষয়ে আলোচনা হয়।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শুধু মামলার এজাহার বা অভিযোগপত্র নয়; আদালতের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং প্রত্যর্পণের আইনি ভিত্তি তুলে ধরা দলিলও আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে। নথিপত্র প্রস্তুত হওয়ার পর সেগুলো প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হবে এবং সেখান থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সময়ের বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দিলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যেতে পারে। এমনকি আইনি জটিলতার কারণে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায়ও পড়তে পারে।
এদিকে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনও। দুদক সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলার তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের আদেশ একত্র করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেছেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলার তদন্ত চলছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে বিচারাধীন মামলাগুলোতে হাজির করা হবে। একই সঙ্গে তদন্তাধীন অভিযোগগুলোতেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে আলোচিত কর্মকর্তাদের একজন বেনজীর আহমেদ। ১৯৮৮ সালে তিনি পুলিশে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি আইজিপি পদে দায়িত্বে ছিলেন।
তার কর্মজীবনের শেষদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও দীর্ঘ সময় তা আনুষ্ঠানিক তদন্তের পর্যায়ে যায়নি। পরে দেশত্যাগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান ও মামলাগুলোর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। আদালত থেকে একাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশও জারি করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, রেড নোটিশ জারির পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। পরে ইন্টারপোলের সহায়তায় গত ১২ জুন তাকে গ্রেপ্তার করে দুবাই পুলিশ।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হওয়ার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মাথায় বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসে। এতে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল মহল মনে করছে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সাধারণত দীর্ঘ ও জটিল হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, প্রশাসন এবং কূটনৈতিক পর্যায়ের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। ফলে বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও গ্রেপ্তারের পরপরই প্রত্যর্পণ সম্পন্ন হবে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবু সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আশাবাদী। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাসময়ে প্রস্তুত করে আরবি ভাষায় অনুবাদসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় জমা দেওয়া সম্ভব হলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পথ অনেকটাই সহজ হবে। সেই লক্ষ্যেই বর্তমানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে দুদক, পুলিশ সদর দপ্তর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা।
খবরটি শেয়ার করুন