ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ছয় দিন পরও রিয়াদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পায়নি ঢাকা। ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে আগে থেকে এ বিষয়ে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে সরকার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সৌদি সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশ।
এ ঘটনায় সৌদি আরবের কাছে আদালতের রায়ের অনুলিপি, কী অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত এবং বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে কেন জানানো হয়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে ঢাকা। কিন্তু আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবের জবাব আসেনি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও আজ প্রকাশিত প্রতিবেদনে সৌদি আরবের কাছ থেকে বাংলাদেশের ব্যাখ্যা না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি কেবল দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকেরা গ্রেপ্তার হলে, বিচার চললে কিংবা তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত হলে রাষ্ট্র তাদের পাশে কতটা কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে যে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন এবং যেখান থেকে আসা প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেই সৌদি আরবের কাছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান কতটা দৃঢ় হবে, তা এখন দেখার বিষয়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অশালীন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এক পুরুষ ও এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে তাদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সিতি আখতার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সরকারিভাবে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া এবং মামলার নথি পাওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবরণে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে অভিযোগের সত্যতা, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ এবং আপিলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এর আগে জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি সম্পর্কে সৌদি সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আদালতের রায়ের অনুলিপি এবং দণ্ডের কারণ জানার পাশাপাশি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে কেন অবহিত করা হয়নি, সে প্রশ্নও তুলেছে ঢাকা। প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের কথা জানিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মনে করছেন, এখানেই প্রশ্ন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ব্যাখ্যা চাওয়াই কি যথেষ্ট? যখন শাস্তি কার্যকর হয়ে গেছে, তখন কূটনৈতিক তৎপরতার উদ্দেশ্য শুধু ঘটনার বিবরণ জানা হতে পারে না। কীভাবে দুই বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হলেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা কখন শুরু হয়, বাংলাদেশি দূতাবাস তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল কি না, তারা আইনজীবী ও আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর বের করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অন্য কোনো বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মামলা হলে, সেই তথ্য সময়মতো পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছেও ব্যাখ্যা চেয়েছে। এর আগে কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ঢাকা কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করেছে। কিন্তু সৌদি আরবের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ জবাব না আসায় সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমান সরকারের সামনে প্রথম করণীয় হওয়া উচিত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জবাব চাওয়া। সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, বাংলাদেশ শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণে সন্তুষ্ট নয়; আদালতের রায়, অভিযোগের বিবরণ, বিচার ও আপিলের নথি এবং আটক অবস্থায় দুই নাগরিকের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাস জানতে চায়। প্রয়োজনে ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতকে আবারও তলব করে বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে তোলার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তথ্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, লোকদেখানো কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা নয়।
অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক কনস্যুলার আইনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিধান রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগাম নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে টানা যায় না। বরং দুই বাংলাদেশির গ্রেপ্তার, আটক, বিচার এবং কনস্যুলার যোগাযোগের ক্ষেত্রে সনদের বিধান মানা হয়েছিল কি না, তা নথি যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ সৌদি আরবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা চললে দূতাবাসের নজরদারি ও যোগাযোগব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা দরকার। সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে থেকে জানায়নি—এটি ঢাকার বক্তব্য। কিন্তু বাংলাদেশের মিশন আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে আগে কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না, তাদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো বার্তা এসেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখাও সমান জরুরি।
সাবেক কয়েক কূটনীতিক সুখবর ডটকমকে বলেন, সরকারের উচিত রিয়াদের জবাবের অপেক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব স্থগিত না রাখা। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দার কনস্যুলেটের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে মৃত্যুদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড কিংবা গুরুতর অপরাধের মামলায় থাকা বাংলাদেশিদের তালিকা পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। যেসব বাংলাদেশি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের মামলার অবস্থা, আইনজীবীর সহায়তা, আপিলের সুযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা সম্পর্কে জরুরি পর্যালোচনা করা দরকার। এ কাজের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
তারা বলেছেন, কূটনৈতিকভাবে আরও কঠোর হওয়ার সুযোগও রয়েছে। সৌদি আরবের কাছে জবাব চাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ চাইতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মামলা হলে তার পরিচয় ও মামলার অবস্থা সম্পর্কে দূতাবাসকে দ্রুত অবহিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও কনস্যুলার আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় মামলার নথি পর্যালোচনা করে কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে। তবে প্রমাণ ও আইনি মূল্যায়ন ছাড়া সৌদি আরব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে বলে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া উচিত হবে না।
সাবেক কূটনীতিকদের অভিমত, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রবাসী শ্রমবাজার। দেশটিতে আনুমানিক ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী বসবাস করেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল সাত লাখ ৫২ হাজার ৭১৫, যা একক কোনো দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। এই বাস্তবতা দুই দেশের সম্পর্ককে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু প্রবাসী আয় ও শ্রমবাজারের গুরুত্বের কারণে নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ নীরব থাকবে—এমন ধারণা তৈরি হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য দেখে সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তথ্য যাচাইয়ের এই সতর্কতা প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকেরা। তাদের মতে, একই সঙ্গে সরকারকেও নিয়মিতভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো অনিশ্চয়তায় না থাকে এবং গুজবের সুযোগ তৈরি না হয়। নিহত দুই নাগরিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিচয় ও মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নথি সংগ্রহ এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্বের অংশ।
তারা বলছেন, এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তারেক রহমান সরকারের কূটনৈতিক দৃঢ়তার। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে, আবার সম্পর্কের গুরুত্বের অজুহাতে প্রশ্নগুলো চাপা না দিয়ে এগোতে হবে। প্রথমে পূর্ণাঙ্গ নথি ও ব্যাখ্যা আদায়, এরপর কনস্যুলার দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি ছিল কি না তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে লিখিত ও কার্যকর ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
তারা আরো বলেন, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের মামলার প্রকৃত বিবরণ জানা, পরিবারের অনিশ্চয়তা দূর করা এবং অন্য বাংলাদেশিদের একই ধরনের ঝুঁকিতে অসহায় হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা এখনো সম্ভব। রিয়াদের জবাব না আসা পর্যন্ত শুধু অপেক্ষা নয়, বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কনস্যুলার ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার শুরু করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
খবরটি শেয়ার করুন