শনিবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৫শে মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত মানচিত্রে পুরো কাশ্মীর ভারতের অংশ! *** এপস্টেইনের কাছে ‘লম্বা, স্বর্ণকেশী সুইডিশ তরুণী’ চেয়েছিলেন আম্বানি *** মোসাদের চর ছিলেন জেফরি এপস্টেইন, জানা গেল এফবিআই নথিতে *** ১২ তারিখ পর্যন্ত চাঁদাবাজি না করতে অনুরোধ বিএনপি প্রার্থীর *** নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: রাষ্ট্রের দায় ও গণতন্ত্রের বাস্তব পরীক্ষা *** ১২ই ফেব্রুয়ারি জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়, দেশ পুনর্গঠনের: তারেক রহমান *** রাজধানীতে ১৪টি জনসভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান *** আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না: সিপিডি *** আওয়ামী লীগ কীভাবে নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ার মতো দুর্বল হলো, যা বলছেন মাহফুজ আনাম *** শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয়: কূটনৈতিক সম্পর্কের অবস্থান স্পষ্ট করলেন তারেক রহমান

শেখ হাসিনাকে ভারত যে কারণে ফেরত দেবে না

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, ২৭শে নভেম্বর ২০২৫

#

ফাইল ছবি

ভারতে অবস্থান করা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠায়। ভারত জবাব দিয়েছিল, তবে শুধু নোট ভারবাল পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করার জন্য, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কিছু জানাতে নয়। ঢাকার দ্বিতীয়বারের আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের অনুরোধের এখনো কোনো জবাব দেয়নি ভারত। এ মুহূর্তে দিল্লি এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেবে—এমন সম্ভাবনা কম।

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত ভারত এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেবে না। শেখ হাসিনাকে দেশে পাঠানোর প্রশ্নে ভারত যুক্তি দিতে পারে যে, তার বিচার সুষ্ঠু হয়নি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বেআইনি ও অসাংবিধানিক। ভারতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে সমর্থন খুবই কম। তার মৃত্যুদণ্ড রায়ের পর এই সমর্থন আরও কমেছে। ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তার প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের স্বায়ত্তশাসিত থিঙ্ক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের (এমপি–আইডিএসএ) গবেষক স্মৃতি এস পট্টনায়কের মতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ‘সীমিত কর্মপরিধি ও দায়িত্বসম্পন্ন একটি রূপান্তরকালীন সরকার। ভারত অপেক্ষা করবে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারা দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে।’ তাই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণের অনুরোধ বিষয়ে একেবারেই কোনো মন্তব্য করেনি। 

গত বছর শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক টানাপোড়েনে আছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো শিগগিরই তাদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করবে। নির্বাচনী প্রচারে বাংলাদেশি দলগুলো শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের সমর্থন এবং তাকে প্রত্যর্পণে দেশটির অনীহার সমালোচনা করবে, ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার চেষ্টা করবে—এটাই স্বাভাবিক।

এ ইস্যুকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের আবেগপ্রবণ সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হলো তার শাসনামলে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক। এর মূল কারণ হলো ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটের সাউথ এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক সুধা রামচন্দ্রন উপরের কথাগুলো বলেছেন। দ্য ডিপ্লোম্যাটে গত ২৪শে নভেম্বর প্রকাশিত এক কলামে তিনি এসব কথা বলেন। তার লেখাটি 'হোয়াই ইন্ডিয়া উইল নট এক্সট্রাডাইট শেখ হাসিনা' (যে কারণে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না ভারত) শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (আইসিটি) মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন গত ১৭ই নভেম্বর। রায় ঘোষণার পর তাকে ফেরত চেয়ে দিল্লিকে তৃতীয় দফায় চিঠি পাঠায় ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই ‘নোট ভারবাল’ (কূটনৈতিক পত্র) ঢাকাস্থ ভারতীয় মিশনের মাধ্যমে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (২৬শে নভেম্বর) পর্যন্ত এ বিষয়ে ভারতের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে এদিন সাংবাদিকদের জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নোট ভ‍ারবাল হলো দুই দেশের সরকারের মধ্যে এক ধরনের 'ডিপ্লোম্যাটিক কমিউনিকেশন' বা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম–কিন্তু তাতে প্রেরকের কোনো স্বাক্ষর থাকে না। নোট ভারবালের রীতি অনুযায়ী, ধরেই নেওয়া যায়, এ ক্ষেত্রে বার্তাটি পাঠানো হয়েছে দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাসের লেটারহেডে এবং তাতে হাইকমিশনের রাবারস্ট্যাম্পও ছিল। এটা একধরনের 'দায়সারা পদক্ষেপে'র চেয়ে বেশি কিছু নয়! এ ক্ষেত্রে একটি নোট ভারবালের চেয়ে হয়তো অনেক বেশি কার্যকরী হত 'লেটার রোগেটরি' পাঠানো।

সাংবাদিক সুধা রামচন্দ্রন দ্য ডিপ্লোম্যাটে নিজের কলামে বলেন, ভারতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে সমর্থন খুবই কম। তার মৃত্যুদণ্ড রায়ের পর এই সমর্থন আরও কমেছে। ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তার (শেখ হাসিনা) প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এর মূল কারণ হলো ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত সমর্থন করেছিল, যেখানে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালে মুজিবের হত্যার পর শেখ হাসিনা ও তার বোন ভারতে আশ্রয় পান এবং সেখানে ছয় বছর অবস্থান করেন।

তিনি লেখেন, বাংলাদেশে অবস্থানকারী ইসলামপন্থী সংগঠন ও ভারতবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সরকারের কঠোর অবস্থান দিল্লিতে প্রশংসিত হয়েছিল। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, এর ফলে ভারতও তার স্বৈরশাসনকে শক্তভাবে সমর্থন করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এক ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’কে (শেখ হাসিনা) মৃত্যুদণ্ডের মুখে ফেলে দেওয়ার জন্য প্রত্যর্পণ করা হলে ভারতের অন্যান্য মিত্রদের কাছেও বার্তা যাবে যে দিল্লি নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণচুক্তিতে বলা আছে, কোনো পক্ষ অনুরোধ করলে দুই দেশকেই সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে কি চুক্তির অধীন ভারতকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতেই হবে? প্রয়োজন নেই।

তার মতে, চুক্তিতে এমন একটি ধারা আছে, যা বলে, অপরাধ যদি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হয়, তবে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। যদিও সেখানে আরও বলা আছে যে হত্যা, খুন, ইচ্ছাকৃত হত্যা ইত্যাদি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু শেখ হাসিনা এই অপরাধগুলোয় সরাসরি জড়িত, এটা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। ভারত আরও যুক্তি দিতে পারে যে শেখ হাসিনার বিচার সুষ্ঠু হয়নি এবং আইসিটি বেআইনি ও অসাংবিধানিক।

তিনি বলেন, ধরে নেওয়া যাক ভারত ঢাকার অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিল। তবু সামনে লম্বা ও জটিল প্রক্রিয়া অপেক্ষা করছে। এতে ভারতে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যর্পণ বিচার অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ অনেক বড়। 

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250