সোমবার, ৬ই এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব *** জুলাই জাতীয় সনদ ঘিরে অনড় সরকার–বিরোধী দল, সমঝোতা নেই *** তারেক রহমান সরকারের প্রথম একনেক সভা *** মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে খেলাধুলার বিকল্প নেই: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী *** প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ *** নতুন সরকারের প্রথম একনেক বৈঠক আজ, অগ্রাধিকার পাচ্ছে ১৭ প্রকল্প *** নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে না *** ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে কনডমের দাম বাড়তে পারে *** সোমবার ইরানের শেষ সুযোগ, মঙ্গলবার পাওয়ার প্ল্যান্ট গুঁড়িয়ে দেবেন ট্রাম্প *** সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আ.লীগের মন্ত্রীদের মতো উত্তর দিয়েছেন: বিএনপির এমপি মনিরুল

নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০৭:৫৯ অপরাহ্ন, ৩রা এপ্রিল ২০২৬

#

নরওয়ের উন্নয়ন সহায়তার অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পুরনো একটি বিতর্ক আবারও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক। ডেনিশ সাংবাদিক টম হেইনেম্যান নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র “কট ইন মাইক্রো ডেট” প্রকাশের পর যে অভিযোগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের ব্যবধানে আবারও সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

২০১০ সালে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনআরকে-এ প্রচারিত “কট ইন মাইক্রো ডেট” প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হয়, ১৯৯০-এর দশকে নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা নোরাড থেকে পাওয়া প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার একটি অংশ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অন্য একটি সংস্থা—গ্রামীণ কল্যাণে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এই স্থানান্তরকে কেন্দ্র করেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত।

প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেওয়া অর্থ একটি পৃথক সামাজিক উন্নয়ন সংস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়, যা মূল প্রকল্পের আওতায় ছিল না। নির্মাতা টম হেইনেম্যান দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল এবং অর্থ ফেরতের বিষয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

অভিযোগ প্রকাশের পর নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা নোরাড বিষয়টি তদন্ত করে। তবে তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

নরওয়ের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে জানানো হয়, অর্থ শেষ পর্যন্ত প্রকল্প সংশ্লিষ্ট খাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ে আর কোনো “অমীমাংসিত প্রশ্ন” নেই। ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিবৃতিতে এই অবস্থান স্পষ্ট করা হয়।

নরওয়ের তৎকালীন আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রী এরিক সোলহেইম মন্তব্য করেন, সহায়তার অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তার এই মন্তব্য বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে, যদিও তিনি অপরাধমূলক দায় সরাসরি আরোপ করেননি।

গ্রামীণ ব্যাংক শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, এটি কোনো আত্মসাতের ঘটনা নয়, বরং একটি “সাময়িক স্থানান্তর”। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কারণে এই স্থানান্তর করা হয়েছিল এবং পরে আপত্তি ওঠার পর পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টিকে “সৎ মতপার্থক্য” হিসেবে ব্যাখ্যা করে এবং দাবি করে যে উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তারা আরও জানায়, কোনো ব্যক্তিগত লাভ বা দুর্নীতির উদ্দেশ্য এতে ছিল না।

অভিযোগটি প্রকাশের সময় বাংলাদেশেও বিষয়টি আলোচিত হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার কথা জানায়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখন ড. ইউনূসকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক সামনে আসছে, তখন এই পুরনো ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরনো তথ্য, প্রতিবেদন ও মতামত নতুন করে শেয়ার করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অভিযোগ ছিল, প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি অংশ মূল উদ্দেশ্যের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে আসে, বিশেষ করে একটি প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে, যা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে।

উন্নয়ন অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে সরলভাবে “দুর্নীতি” বা “নির্দোষ ভুল” হিসেবে দেখার পক্ষে নন। তাদের মতে, এখানে মূল প্রশ্ন হলো—প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও চুক্তির শর্ত মেনে চলা।

তাদের ভাষায়, “এই ঘটনাটি দেখায় যে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে অর্থ স্থানান্তর বা পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও প্রক্রিয়াটি যদি চুক্তি অনুযায়ী না হয়, তাহলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।”

আন্তর্জাতিক সহায়তা খাতের আরেক গবেষক বলেন, “এখানে ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রমাণ না থাকলেও ‘গভর্ন্যান্স’ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন, যদিও তদন্তে তা প্রমাণিত হয়নি।

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যদি অর্থ স্থানান্তর চুক্তি ভঙ্গ করে করা হয়, তাহলে সেটি অনিয়ম—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।” আরেকজন মন্তব্য করেন, “নোবেলজয়ী হলেই জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত থাকা যায় না।”

অনেকে আবার বিষয়টিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরনো ঘটনাগুলোকে নতুনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। তবে একটি অংশের নেটিজেন তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, “তদন্তে যেহেতু আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা ঠিক নয়। তবে প্রক্রিয়াগত ভুল থাকলে সেটি স্বীকার করা উচিত।”

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—উন্নয়ন সহায়তার অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই প্রশ্নের উত্তরই মূলত বিতর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই ধরনের বিতর্ক তাদের কার্যক্রমের ওপর আস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

নরওয়ের সহায়তা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এই বিতর্কটি শুধু একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতিমালার প্রশ্নও তুলে ধরে।

তদন্তে অপরাধমূলক কার্যকলাপের প্রমাণ না মিললেও, প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফলে এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থাপনায় শুধু সৎ উদ্দেশ্য নয়, সঠিক পদ্ধতিও সমানভাবে জরুরি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250