কুমিল্লার বীর মক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুর গলায় জুতার মালা পরানোর একটি ভিডিও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
দেশীয় গণমাধ্যমে প্রতিদিন অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু খুব কম প্রতিবেদনই এমনভাবে সমাজের গভীরতম বোধকে নাড়িয়ে দেয়, যেমনটি করেছে দৈনিক কালের কণ্ঠে আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত “ইউনূস আমলে মুক্তিযোদ্ধা পীড়নের দেড় বছর” শিরোনামের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি। এমন অভিমত নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের।
প্রকাশের পরপরই কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কারণ কেবল তথ্য নয়, এতে উঠে এসেছে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিবেদনের বিশেষত্ব একাধিক কারণে অনন্য। প্রথমত, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত একটি প্রবণতাকে প্রমাণসহ তুলে ধরেছে।
দ্বিতীয়ত, এখানে শুধু অভিযোগ নয়, নির্দিষ্ট সময়সীমা, পরিসংখ্যান, ঘটনা ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। তৃতীয়ত, এটি রাজনৈতিক ভাষ্য নয়, বরং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মৌলিক শক্তি—তথ্য, বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপটের সমন্বয়ে নির্মিত একটি শক্তিশালী দলিল। প্রতিবেদনটি লিখেছেন কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে, আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দশ বছরে যেখানে প্রায় ৩৫টি ঘটনায় ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত ও ৫৯ জন আহত হয়েছেন, সেখানে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র দেড় বছরে ২৫টি বেছে নেওয়া নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছেন অন্তত দুইজন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন।
সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। আগের ঘটনাগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন, নানা সামাজিক বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল। কিন্তু ড. ইউনূসের দেড় বছরে ঘটনাগুলোর বৈশিষ্ট্য ভিন্ন—এখানে মুক্তিযোদ্ধা হওয়াটাই যেন অপরাধে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্লেষণই কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক বলে মনে করছেন অনেক নেটিজেন।
প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—দেশের অতীত ‘রিসেট’ করার ধারণা। এই ধারণা যখন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে উচ্চারিত হয়, তখন তা শুধু একটি বাক্য থাকে না—এটি একটি মানসিকতা তৈরি করে। সেই মানসিকতার প্রতিফলনই আমরা দেখি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙচুর, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, কিংবা মুজিবনগরে শত শত ভাস্কর্য ধ্বংসের ঘটনায়।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস ‘রিসেট বাটন চাপা’র কথা উল্লেখ করে বোঝান, দেশের অতীত সব মুছে গেছে। এসব বক্তব্যে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার ইঙ্গিতে প্রবল সমালোচনা শুরু হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জাতিকে হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যার বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জাতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ৪ ডিসেম্বর কুমিল্লায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ন্যক্কারজনকভাবে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে যায়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এর পর থেকে ইউনূস আমলের দেড় বছরে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধা হত্যা-নির্যাতন-অপমানের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙাসহ সব চিহ্ন মুছে ফেলা; বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর ভবন প্রশাসনের সহায়তায় গুঁড়িয়ে দেওয়া, গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্য ভাঙচুর, মেহেরপুরে মুজিবনগরের প্রায় ৩০০ ভাস্কর্য একদিনে ভাঙচুরের ঘটনায় দেশপ্রেমী মানুষ হতবাক হয়ে যায়।
অভিজ্ঞরা বলেন, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ভাঙচুর নয়; এগুলো ইতিহাস মুছে ফেলার সাংকেতিক প্রচেষ্টা। আর এই প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণগুলো আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নেটিজেনদের মতে, কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনটির সবচেয়ে নাড়া দেওয়া অংশ হলো নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর বর্ণনা। রংপুরের তারাগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা—এটি শুধু একটি খুন নয়, এটি একটি বার্তা। একটি সম্ভাব্য পরিকল্পিত সহিংসতা, যার পেছনে আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং হয়তো আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনরা।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করার ঘটনা—এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। একজন মানুষ, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাকে প্রকাশ্যে এভাবে অপমান করা—এটি কেবল ব্যক্তিগত অপমান নয়, এটি পুরো জাতির প্রতি অবমাননা।
ঘটনার পরও বিচারহীনতার যে চিত্র উঠে এসেছে—আসামিদের দ্রুত জামিন, ভুক্তভোগীর পরিবারকে হুমকি, মামলা তুলে নেওয়ার চাপ—এসবই একটি ভীতিকর বাস্তবতা নির্দেশ করে: রাষ্ট্র হয় অক্ষম, নয়তো অনিচ্ছুক।
প্রতিবেদনটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করছেন, যেন তাদের বোঝানো হচ্ছে—মুক্তিযুদ্ধ করে তারা অপরাধ করেছেন। এই মানসিক চাপ, সামাজিক অপমান এবং শারীরিক নির্যাতনের সম্মিলিত প্রভাব তখন এক ধরনের অস্তিত্ব সংকট তৈরি করে।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যখন বলেন, “এই বাংলাদেশের জন্য আমার আব্বা দেশ স্বাধীন করেননি”—তখন এটি শুধু ক্ষোভ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ভাঙনের প্রকাশ। কালের কণ্ঠের আলোচ্য প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে—এই ঘটনাগুলো কি কেবল ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার কাজ, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি পরিকল্পিত প্রবণতা?
ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু (মুক্তিযোদ্ধা), এবং রাষ্ট্রের নীরবতা—এসব বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল স্বতঃস্ফূর্ত নয়। বরং একটি সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নামে। নেটিজেনদের অভিযোগ, সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশাসন তখন নির্লিপ্ত থেকেছে, কিংবা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করেছে। রাষ্ট্র যদি তার বীর সন্তানদের রক্ষা করতে না পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়—এই প্রশ্ন অনিবার্য।
এই প্রতিবেদন ভাইরাল হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট বলে মনে করেন অনেক নেটিজেন। তাদের মতে, প্রতিবেদনটি আবেগ ও বাস্তবতার সংমিশ্রণ: এটি কেবল তথ্য দেয়নি, মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করেছে। পরিসংখ্যান, প্রেক্ষাপট ও ঘটনার বিশ্লেষণ এটিকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে।
স্পর্শকাতর বিষয় হলেও প্রতিবেদনটি নির্ভীকভাবে সত্য তুলে ধরেছে। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই ভিত্তির ওপর আঘাত মানেই জাতির আত্মপরিচয়ে আঘাত। ইতিহাসের এই দায় এড়ানো যায় না। দেশের স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়—এটি একটি জাতির অর্জন। আর সেই অর্জনের নায়ক মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের অপমান মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
নেটিজেনরা বলছেন, দৈনিক কালের কণ্ঠের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি আমাদের ইতিহাসের প্রতি সৎ আছি? যদি একটি রাষ্ট্র তার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? সম্ভবত এ কারণেই, প্রতিবেদনটি শুধু ভাইরাল হয়নি—এটি একটি জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন