ছবি: সংগৃহীত
একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্ট কলাম লেখক ড. মইনুল ইসলাম দাবি করেছেন, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেডগুলো পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) সরবরাহ করেছিল বলে এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ওই সময় ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কর্তাব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ মদদে ওই হামলার প্রধান কুশীলবেরা পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, সেটাও এরই মধ্যে প্রমাণিত।
গণহত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার 'বিনাশর্তে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য এত লালায়িত কেন', মইনুল ইসলামের এই প্রশ্ন সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের 'বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন ও উন্নয়নের জন্য' বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী কোনো নাগরিক কীভাবে আজও পাকিস্তান অনুরাগী হতে পারেন?'
১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের সামরিক-বাহিনী-সমর্থিত শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের কাছে এখনো ক্ষমাপ্রার্থনায় রাজি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেজন্যই অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তাব্যক্তি এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাছে প্রশ্ন, বাংলাদেশ যেখানে একটি দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে গো-হারা হারিয়ে দৃপ্তপদে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে পাকিস্তানকে অযৌক্তিক সুবিধা দেওয়ার আলাপ কেন? পাকিস্তান অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৌড়ে আর কখনই বাংলাদেশের নাগাল পাবে না।
অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপকের প্রশ্ন, পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব পুনর্বহাল করে আবার তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে এ দেশে ঘাঁটি গেড়ে বসতে দিচ্ছে না তো? প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অর্বাচীনদের প্রতি নমনীয়তা এবং অযৌক্তিক লাই দেওয়ার মানসিকতা তাকে ক্রমশ বিতর্কিত করে তুলছে। সময় থাকতে ভুল সংশোধনে যত্নবান না হলে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন ড. ইউনূস।'
'বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্কে নয়া মোড় বোঝাপড়া' শিরোনামে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মইনুল ইসলাম এসব কথা বলেন। তার এ লেখা গত বুধবার (১৭ই সেপ্টেম্বর) দৈনিক বণিক বার্তার ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়। তার লেখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী আলোচনা চলছে নেটিজেনদের মধ্যে। অনেকে বলছেন, গত এক থেকে দেড় বছর ধরে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে এ ধরনের আলোচনা হচ্ছে না। লেখাটি প্রকাশের জন্য অনেকে বণিক বার্তার কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম লেখেন, সম্প্রতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফরের সময় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গণহত্যা চালানোর জন্য পাকিস্তান দীর্ঘদিন পরও বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায়নি কেন জানতে চাইলে তিনি দম্ভভরে বলেছেন, ‘দুইবার বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে’। ইসহাক দারের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও দাম্ভিক উক্তির পর পাকিস্তানের সঙ্গে আর কোনো আলাপ-আলোচনা চালানোই বাংলাদেশের সরকারের উচিত হয়নি। পাকিস্তান বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং গণহত্যার জন্য দায়ী শত্রুরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অনেক সরকার পাকিস্তানপন্থী এবং ভারতবিরোধী থাকার সুবাদে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করেনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসেই বিষয়টি দুই দেশের সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রধান শর্তে পরিণত করায় আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে চলে যায়।
তার মতে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার পাকিস্তান বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুতে পরিণত হয়। বিএনপি-জামায়াতের ২০০১-০৬ শাসনের মেয়াদে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায় চলে এসেছিল বলে মনে করেন অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ফলে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে অভয়ারণ্য পেয়ে যায় এবং ওইসব গোষ্ঠীর অস্ত্রশস্ত্র জোগানের প্রধান রুটে পরিণত হয়ে যায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ২০০৪ সালে ১০ ট্রাক অস্ত্রশস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে যাওয়ার পর বিষয়টি সারা বিশ্বের নজরে চলে আসে। ...২০০১-০৬ মেয়াদে সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে সারাদেশে সশস্ত্র বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর অভূতপূর্ব তাণ্ডব শুরু হয়ে গিয়েছিল। হংকং থেকে প্রকাশিত ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’ ওই সময় বাংলাদেশকে ‘কুকুন অব টেরর’ নামে অভিহিত করেছিল। ২০০৫ সালে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় একই সময়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর মাধ্যমে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো জাতিকে জানান দিয়েছিল যে, তারা দেশের ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত।
তিনি আরো লেখেন, ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ওই বেলাগাম জঙ্গিপনা ও তাণ্ডব থেকে মুক্তি পেয়েছিল। ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি ক্ষমতায় ফিরে এসে শেখ হাসিনা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এরপর যখন তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু করেন, তখন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আবার তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ওই বিচারের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বিশ্বের সব প্রভাবশালী দেশে প্রোপাগান্ডা-যুদ্ধ চালিয়েছে।
এই অর্থনীতিবিদ লেখেন, স্বাধীনতা-উত্তর ৫৪ বছরে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন বারবার বিঘ্নিত হলেও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়ে গেছে, যা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের জনগণের জন্য কতখানি যৌক্তিক ছিল। ২৪ বছর যে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’ হিসেবে শোষিত, বঞ্চিত ও লুণ্ঠিত হয়েছিল, সেটার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বর্তমান পাকিস্তানের তুলনামূলক তথ্য-উপাত্তগুলোতে যথেষ্ট প্রমাণ হবে।
খবরটি শেয়ার করুন