সোমবার, ১৬ই মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২রা চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রাজধানীতে প্রকাশ্যে গুলি করে কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে হত্যা, আটক ১ *** লালমনিরহাটের ‘এমপি সাহেবের থার্টি পারসেন্টের’ কথোপকথনের অডিও ভাইরাল *** এখনো মরেননি নেতানিয়াহু, ভিডিওতে দেখালেন হাতের ৫ আঙুল *** দলীয় পদে থাকা কারাবন্দী ও মামলার শিকার সাংবাদিকদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী হবে *** বৈষম্য, গ্রেপ্তার, মৃত্যু ও যুদ্ধের নীরব ভুক্তভোগী বাংলাদেশিরা *** ইরানে আরও তিন সপ্তাহ হামলা চালাবে ইসরায়েল *** সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি ও বিরোধী দলের বাহাস *** ‘রাষ্ট্রপতি অস্তিত্বহীন সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে পারেন না’ *** ‘৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার নির্দেশ কারা দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার’ *** ডিজিএফআই–প্রধানের দিল্লি সফরে সম্পর্কের বরফ গলার আভাস

জামিনের পরও ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ নিয়ে উদ্বেগ, আইনের শাসনের জন্য ঝুঁকি দেখছেন বার্গম্যান

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন, ১৬ই মার্চ ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো বা শ্যেন অ্যারেস্ট করার প্রবণতা আবারও ফিরে আসছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি মনে করেন, এই ধরনের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে অতীতে যে ধরনের আইনের অপব্যবহার হয়েছিল, তা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করবে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে গতকাল রোববার—কন্টিনিউড ইউজ অব পোস্ট-বেইল ‘শোন অ্যারেস্টেড’ কেইসেস রিস্কস রিপিটিং পাস্ট অ্যাবিউজেস—শিরোনামে প্রকাশিত এক কলামে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি লিখেছেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিতর্কিত কৌশল ব্যবহার করা হলে তা আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে।

বার্গম্যানের মতে, আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কোনো ব্যক্তিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হলে সেই জামিন কার্যত অর্থহীন হয়ে যায়। তিনি বলেন, এটি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে তা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি কোথায়

তিনি বলেন, নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন কীভাবে হবে?’ তার উত্তর ছিল সরল, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে।’

তার অভিযোগ, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীত্বের এক মাস না যেতেই আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ মামলার ওপর সরকারের অব্যাহত নির্ভরতা ইঙ্গিত দেয়, তারেক রহমানের কথাগুলো কেবল কথা হয়েই রয়ে গেছে। এ ধরনের আটকাদেশের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার আইনের শাসনের বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

কলামে ডেভিড বার্গম্যান স্মরণ করিয়ে দেন যে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের পক্ষ থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে যদি একই ধরনের আটক ও গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তবে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

তিনি লেখেন, সরকার বলতে পারে যে অতীতের অন্যায়গুলো মোকাবিলায় তাদের সময় প্রয়োজন। কিন্তু নতুন করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যা বেআইনি আটক সৃষ্টি করে—তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

তার মতে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তাহলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বার্গম্যান আরও উল্লেখ করেন, ফৌজদারি কার্যবিধির একটি বিধান অনুযায়ী কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনের পেছনে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই শর্ত প্রায়ই কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে আদালতের দেওয়া জামিন বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না।

খায়রুল হক ও সেলিনা হায়াৎ আইভীর উদাহরণ

কলামে বার্গম্যান কয়েকটি সাম্প্রতিক উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক একাধিক মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পরও আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। যদিও সেই মামলার মূল এফআইআরে তার নাম ছিল না।

বার্গম্যানের মতে, এমন ঘটনা থেকে ধারণা করা যায় যে এসব সিদ্ধান্ত স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের একার উদ্যোগে নেওয়া হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পর্যায় থেকে নির্দেশনা থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। একাধিক মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তাকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই ঘটনাগুলো বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে মন্তব্য করেন বার্গম্যান।

বিচারকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে বিচারকদের স্বাধীন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যদি পুলিশ প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার দেখাতে চায়, তবে আদালতের উচিত তা প্রত্যাখ্যান করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেটরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দিয়ে থাকেন। তার ভাষায়, “ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রায়ই নির্বাহী বিভাগের সম্প্রসারিত অংশের মতো কাজ করেন।”

তিনি মনে করেন, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—বিচারকেরা যেন আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, রাজনৈতিক সংকেতের ভিত্তিতে নয়।

রাজনৈতিক প্রতিশোধের ঝুঁকি

বার্গম্যান আরও সতর্ক করেছেন যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরকার পরিবর্তনের সময় প্রতিশোধমূলক বিচারপ্রক্রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তার মতে, সমাজের একটি অংশ মনে করতে পারে যে আগের সরকারের সঙ্গে যুক্ত সবাই অপরাধী। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তিনি লিখেছেন, “অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত যে কেউই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য—প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক।” এই ধরনের মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে আইনের শাসনের জন্য বিপজ্জনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জামিনের পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি নতুন নয়; বাংলাদেশে অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার একজন মানবাধিকার আইনজীবী বলেন, “জামিন পাওয়ার পর আবার গ্রেপ্তার দেখানো হলে আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়। এতে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।”

আরেকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞের মতে, বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তার ভাষায়, “আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হলে আদালতকে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে।”

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান

কলামের শেষ অংশে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, যদি সরকার সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তার মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটক রাখার জন্য মামলার অপব্যবহার করলে তা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং পুরো বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের সহিংসতায় নিহতদের জন্য প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার প্রয়োজন। ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে কাউকে অভিযুক্ত করা সেই বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অসম্মানজনক।

বার্গম্যানের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকার, পুলিশ এবং বিচার বিভাগ—সবাইকে নিজেদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে হবে।

বার্গম্যান মূলত কলামে বলতে চেয়েছেন—বাংলাদেশে জামিনের পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো যদি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।

ডেভিড বার্গম্যান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250