ছবি: সংগৃহীত
বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কী আছে—উড়োজাহাজের বহর বাড়ানোর প্রয়োজন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ? এ প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে সরকারের দুই মন্ত্রীর বক্তব্যে। একদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধেই বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কিনছে এবং ১৪টি বোয়িং কেনার পাশাপাশি আরও উড়োজাহাজ ইজারা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, কোনো চাপের কারণে নয়, বরং দেশের উড়োজাহাজের বহরের প্রয়োজনেই বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের কারণ নিয়ে সরকারের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
গতকাল সোমবার (৩১ আগস্ট) ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং উড়োজাহাজ ব্যবহারের কথা বলেছেন। এরপরই বাংলাদেশ বোয়িং কিনছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ট্রাম্প একটা জিনিস চেয়েছেন যে, “আমাদের বোয়িংগুলো ব্যবহার করেন।” আমরা করছি, আমরা কিনছি। ১৪টি বোয়িং কিনছি, আরও আমরা ইজারা নেব।’
তবে একই বক্তব্যে মন্ত্রী জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নেই। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে তৈরি এয়ারবাস থেকেও উড়োজাহাজ কেনার কথা বলেন তিনি। অর্থাৎ বিমানের বহর বড় করার পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাই তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী এমন বক্তব্য দেওয়ার এক দিন আগে, ৩০ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে ‘আরেকটি অসাধারণ চুক্তি’ হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগের ক্রয়াদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানান তিনি। তবে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে বা এর মূল্য কত—সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি গোর।
সার্জিও গোরের বক্তব্যের পরই বোয়িং কেনার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। কারণ, ৩০ এপ্রিলই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। বোয়িংয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই বহরে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। এটিই বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ ক্রয়াদেশ।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ এপ্রিলের প্রতিবেদনে জানায়, ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিটি তালিকামূল্য অনুযায়ী প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের। চুক্তিটিকে তারা ইউরোপের এয়ারবাসের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের দিকে বাংলাদেশের বড় ধরনের ঝুঁকে পড়া হিসেবে বর্ণনা করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং সম্ভাব্য শুল্কচাপ মোকাবিলার বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিবেচনাও এ সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
এর আগে শেখ হাসিনার সরকারের সময় এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই পরিকল্পনার চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বিষয়টি এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিমানের বহর আধুনিকায়নের প্রয়োজনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টিও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বোয়িং কেনার পেছনে কোনো ধরনের মার্কিন চাপের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘না, কোনো চাপের কারণে নয়।’ তার ভাষ্য, দেশের বিমান পরিবহন খাতের চাহিদা অনুযায়ী উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর যুক্তি, বিমানের উড়োজাহাজের বহর সক্ষম না হলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা যাবে না। একই সঙ্গে যাত্রী ও রাজস্ব বাড়াতে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘ মেয়াদে নতুন উড়োজাহাজ কিনতে হবে। তার হিসাবে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বাংলাদেশের ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী বোয়িং কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হুমায়ুন কবির একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেমন বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো। সরকার বৈদেশিক সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এখানেই সরকারের দুই পক্ষের বক্তব্যে মূল পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। রশিদুজ্জামান মিল্লাতের বক্তব্যে বোয়িং কেনার সঙ্গে ট্রাম্পের অনুরোধের সরাসরি যোগসূত্রের কথা এসেছে। বিপরীতে হুমায়ুন কবির বিষয়টিকে বিমান পরিবহন খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং কোনো চাপের বিষয়টি নাকচ করেছেন। আবার সার্জিও গোরের বক্তব্যে আগের ১৪টি উড়োজাহাজের বাইরে আরও বড় ক্রয়াদেশের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তার পরিমাণ বা সময়সীমা পরিষ্কার নয়।
এ কারণে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, সার্জিও গোর যে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের’ অতিরিক্ত ক্রয়াদেশের কথা বলেছেন, সেটি নতুন কোনো চুক্তি কি না। কারণ ৩০ এপ্রিলের ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তি ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রথম আলোও ৩১ আগস্টের প্রতিবেদনে সার্জিও গোরের বক্তব্য তুলে ধরে জানিয়েছে, তিনি অতিরিক্ত কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে তা উল্লেখ করেননি।
এর মধ্যে আজ আরও একটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো চিঠিতে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেছেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না। একই চিঠিতে তিনি শিগগিরই তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের আশাও প্রকাশ করেছেন।
বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩০ এপ্রিলের চুক্তির ক্ষেত্রে উড়োজাহাজগুলো ধাপে ধাপে সরবরাহ করার কথা। বোয়িং জানিয়েছে, নতুন উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহর আধুনিকায়ন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন রুটে সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বোয়িং কেনার সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের প্রয়োজনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। রয়টার্সের ৩০ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কচাপও তখনকার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে ছিল।
তবে এখন সার্জিও গোরের নতুন বক্তব্য এবং ট্রাম্পের চিঠির পর প্রশ্ন উঠেছে, এপ্রিলের ১৪টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশের পর বাংলাদেশ কি সত্যিই আরও বড় পরিমাণে বোয়িং কিনতে যাচ্ছে? সরকার যদি অতিরিক্ত কোনো ক্রয়চুক্তি করে থাকে, তার সংখ্যা, অর্থমূল্য, অর্থায়নের ধরন ও সরবরাহের সময়সূচি প্রকাশ করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। একই সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—দুইয়ের কোনটি কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটিও তখন আরও স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, ৩১ আগস্ট মন্ত্রীর বক্তব্য, ৩০ আগস্ট সার্জিও গোরের ঘোষণা এবং ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য—তিনটি তথ্য পাশাপাশি রাখলে বোয়িং কেনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত অবশ্যই চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে হয়েছে; কিন্তু এর বাইরে আরও ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের’ ক্রয়াদেশের যে দাবি এসেছে, তার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
খবরটি শেয়ার করুন