ফাইল ছবি
ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাতের মাত্রায় ২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। ওই বছর বিশ্বের ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ৫৫টিতে ধর্মসম্পর্কিত সামাজিক সংঘাতের মাত্রা উচ্চ বা খুবই উচ্চ পর্যায়ে ছিল। আগের বছর এমন দেশের সংখ্যা ছিল ৪৫। আর ২০২৩ সালে ধর্মকে ঘিরে সামাজিক সংঘাতের মাত্রা ‘খুবই উচ্চ’ পর্যায়ে থাকা ছয় দেশের একটি ছিল বাংলাদেশ। অন্য পাঁচটি দেশ হলো নাইজেরিয়া, ভারত, ইসরায়েল, সিরিয়া ও পাকিস্তান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১৫ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের পরিস্থিতি নিয়ে করা এই গবেষণায় ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাতের মধ্যে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত হয়রানি, হামলা, সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সামাজিক সংঘাত সূচকের স্কোর ছিল ৭ দশমিক ৮। ২০২২ সালে এই স্কোর ছিল ৬ দশমিক ১। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের স্কোর বেড়েছে ১ দশমিক ৭ পয়েন্ট। এর ফলে বাংলাদেশ ‘উচ্চ’ থেকে ‘খুবই উচ্চ’ শ্রেণিতে উঠে আসে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ১ দশমিক ৪ স্কোর ‘নিম্ন’, ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ ‘মাঝারি’, ৩ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ১ ‘উচ্চ’ এবং ৭ দশমিক ২ থেকে ১০ ‘খুবই উচ্চ’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৩ সালে ছয়টি দেশের সামাজিক সংঘাত সূচকের স্কোর ছিল অন্তত ৭ দশমিক ৫। এর মধ্যে নাইজেরিয়ার স্কোর ৯, ভারতের ৮ দশমিক ৮, ইসরায়েলের ৮ দশমিক ৪, বাংলাদেশের ৭ দশমিক ৮ এবং পাকিস্তানের ৭ দশমিক ৫। সিরিয়াও ‘খুবই উচ্চ’ শ্রেণিতে ছিল। আগের বছর বাংলাদেশ ও ইসরায়েল—দুই দেশই ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে ছিল। অন্যদিকে আফগানিস্তান, মিসর ও ইরাক ২০২২ সালে ‘খুবই উচ্চ’ থাকলেও ২০২৩ সালে ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে নেমে যায়।
বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতির পেছনে ২০২৩ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘবদ্ধ সহিংসতায় মৃত্যুর ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখেছে পিউ রিসার্চ। বিশেষ করে ৩ ও ৪ মার্চ পঞ্চগড়ের আহমেদনগরে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বার্ষিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে হামলা ও সহিংসতার ঘটনা গবেষণায় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পিউ রিসার্চ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় শত শত মানুষ আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালায়। এতে দুজন নিহত ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। হামলাকারীরা বহু আহমদিয়া বাড়ি, একটি মসজিদ ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
পঞ্চগড়ের ঘটনাটি নিয়ে সে সময় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আহমদিয়াদের তিন দিনের বার্ষিক জলসা বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের কর্মী-সমর্থকেরা বিক্ষোভ করছিলেন। ৩ মার্চ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারীরা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও দোকানে আগুন দেয় এবং পুলিশের স্থাপনা ও যানবাহনেও হামলা চালায়। পরদিনও এলাকায় উত্তেজনা ছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পঞ্চগড়ের ঘটনা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ ও ৪ মার্চ আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বার্ষিক সম্মেলনে শত শত মানুষ হামলা চালায়। প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। হামলার পর হাজারো অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা এবং দুই শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টও ওই হামলাকে বাংলাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। পত্রিকাটি লিখেছিল, পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পর তাদের বসতিপূর্ণ কয়েকটি গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পর বহু বাড়ি লুট ও ভাঙচুর করা হয় এবং কিছু বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ধর্মীয় মতপার্থক্যের সমাধান সহিংসতার মাধ্যমে নয়, আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করা হয়।
পঞ্চগড়ের ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগেই দেশের আরেক প্রান্তে ধর্মীয় অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটে। জানুয়ারিতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এক হিন্দু ব্যক্তির বাড়িতে কয়েক শ মানুষ হামলা চালায়। অভিযোগ ছিল, ওই ব্যক্তি ফেসবুকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করে একটি পোস্ট দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের একটি দল ওই বাড়িতে হামলা চালায়।
দেশীয় সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘটনার সময় অন্তত চারটি হিন্দু বাড়ি ও আটটি দোকান ভাঙচুর করা হয়। ফেসবুক পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক শ মানুষ সেখানে হামলা চালায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ধর্মীয় সংঘাতের এই ঘটনাগুলোই ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সামাজিক সংঘাত সূচকের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে পিউ রিসার্চ জানিয়েছে। তবে গবেষণাটি শুধু বাংলাদেশ বা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে নয়; বিশ্বজুড়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক উত্তেজনা ও সরকারি বিধিনিষেধের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে।
পিউ রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ৫৫টিতে ধর্মসম্পর্কিত সামাজিক সংঘাতের মাত্রা উচ্চ বা খুবই উচ্চ ছিল। এর মধ্যে ছয়টি দেশে তা ছিল খুবই উচ্চ এবং ৪৯টি দেশে উচ্চ। ২০২২ সালে খুবই উচ্চ শ্রেণিতে ছিল সাতটি দেশ, আর ৩৮টি দেশে ছিল উচ্চ মাত্রার সামাজিক সংঘাত। অর্থাৎ খুবই উচ্চ শ্রেণির দেশের সংখ্যা সামান্য কমলেও উচ্চ বা খুবই উচ্চ—দুই শ্রেণি মিলিয়ে দেশের সংখ্যা বেড়েছে ১০টি। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অবশ্য সামাজিক সংঘাতের মাত্রা ছিল নিম্ন বা মাঝারি; ২০২৩ সালে ৯৪টি দেশে তা নিম্ন এবং ৪৯টি দেশে মাঝারি ছিল।
গবেষণায় ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের বিষয়টিও আলাদাভাবে পরিমাপ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ৫৮টিতে ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা উচ্চ বা খুবই উচ্চ ছিল। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৯। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে এক বছরে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০২৩ সালে ২৫টি দেশে সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা ছিল ‘খুবই উচ্চ’। এসব দেশের মধ্যে ছিল চীন, ইরান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া ও উজবেকিস্তান।
বাংলাদেশের সরকারি বিধিনিষেধ সূচকের স্কোর ২০২৩ সালে ছিল ৫ দশমিক ৫। অর্থাৎ এই সূচকে বাংলাদেশ ‘উচ্চ’ বা ‘খুবই উচ্চ’—কোনোটিতেই ছিল না; তবে সামাজিক সংঘাত সূচকে দেশটির অবস্থান ছিল ‘খুবই উচ্চ’। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় সামাজিক সংঘাত ও সরকারি বিধিনিষেধ—দুটি বিষয় আলাদা সূচকে পরিমাপ করা হয়। ফলে কোনো দেশে সরকারি বিধিনিষেধ তুলনামূলক কম হলেও সেখানে সামাজিক পর্যায়ে ধর্মীয় সংঘাত বেশি হতে পারে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এই গবেষণার ভিত্তি দুটি সূচক। প্রথমটি সামাজিক সংঘাত সূচক—এসএইচআই। এতে ধর্মসম্পর্কিত ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও সংগঠনভিত্তিক শত্রুতার ১৩টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর হয়রানি, হামলা, সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও রয়েছে। দ্বিতীয়টি সরকারি বিধিনিষেধ সূচক—জিআরআই। এতে সরকার, সরকারি কর্মকর্তা, আইন ও নীতির মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ২০টি বিষয় বিবেচনা করা হয়। দুই সূচকেরই স্কোর শূন্য থেকে ১০-এর মধ্যে নির্ধারণ করা হয়।
গবেষণাটি মূলত ২০২৩ সালের পরিস্থিতি পরিমাপ করলেও এর তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য আরও বিস্তৃত। কারণ, একটি দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় আইন বা নীতির ওপর নির্ভর করে না; সমাজে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। পিউ রিসার্চের পরিমাপ সেই সামাজিক বাস্তবতাকেই আলাদা করে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের ২০২৩ সালের স্কোর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পঞ্চগড়ের আহমদিয়া-বিরোধী সহিংসতা এবং গোপালগঞ্জে হিন্দু পরিবারের ওপর হামলা—দুটি ঘটনাই বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে পিউ রিসার্চ। একই সঙ্গে গবেষণাটি দেখিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাত বাড়ছে এবং ২০২৩ সালে উচ্চ বা খুবই উচ্চ মাত্রার সংঘাতের আওতায় পড়া দেশের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের ৭ দশমিক ৮ স্কোরকে শুধু একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে ২০২৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সূচকও।
খবরটি শেয়ার করুন