ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের এক বছরের বেশি সময় পর হত্যা ও সহিংসতা মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে আছে অন্তত ২৯৬ সাংবাদিকের নাম। প্রকৃত সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছে ইংরেজি পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টার। এ পর্যন্ত অন্তত ১৮ জন সাংবাদিককে অভ্যুত্থানের পর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা কারাগারে আছেন।
তারা জামিন পাচ্ছেন না। পত্রিকাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাইয়ে নিহতদের ত্যাগের বিচার প্রতিষ্ঠার বদলে মামলাগুলো এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। হয়রানি, ভোগান্তি ও আতংকের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। মামলাগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে গণমাধ্যম নিপীড়নে।
এসব মামলার বেশিরভাগ বাদী ‘সাংবাদিক আসামিদের’ চেনেন না। বিষয়টি বিভিন্ন মামলার বাদীর গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এর মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সরকারের ‘সহযোগী, সুবিধাভোগী’ অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা দায়ের হয়।
গত বছরের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত, জ্যেষ্ঠ ও বিশিষ্ট অনেক সাংবাদিককে অভিযুক্ত করে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। এসব প্রতিবেদনের বেশিরভাগেই অভিযুক্ত সাংবাদিকের কোনো বক্তব্য নেই। এগুলোতে উপেক্ষিত হয়েছে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার নীতিমালা।
গণমাধ্যমের নীতিমালা অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ের অভিযুক্ত সাংবাদিকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি প্রতিবেদনগুলোতে। একতরফা এসব প্রতিবেদন নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো নানা সমালোচনার শিকার হয়ে আসছিল। তবে এই প্রথম ডেইলি স্টারে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি বিষয়ক প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জ ই মামুনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোদ্ধা নেটিজেনেরা এতে সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বক্তব্যের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টির প্রতিফলন দেখছেন। ‘জার্নালিস্টস ট্র্যাপড ইন লিগ্যাল ম্যাজ’ শিরোনামে গতকাল ২রা নভেম্বরে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জ ই মামুনের বক্তব্য যুক্ত হয়।
দীর্ঘ বছর ধরে টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করেন জ ই মামুন। গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুটি হত্যা মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি অভিযোগে তার নাম আছে। তিনি বাদীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তারা তাকে চেনেনও না। তার মতো সাংবাদিকেরা আসামি হলেও অনেক বাদী তাদের চেনেন না। অনেক বাদী তার মামলার আসামি সাংবাদিকের নাম পর্যন্ত জীবনে শোনেননি।
ডেইলি স্টার জ ই মামুনের সঙ্গে মতামতের জন্য যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগী মিরপুরে (ঢাকা) নিহত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে আমার খারাপ লেগেছে। কিন্তু তার হত্যার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তার ভাই মামলা দায়ের করেছিলেন আইনজীবী ও পুলিশের সাহায্যে।’ তিনি আরও জানান, আরেকটি মামলা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা খিলগাঁও থেকে দায়ের করেন ঘটনার এক বছর পর।
বিশিষ্টজনদের মতে, সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে কোনো ব্যক্তি, বা গোষ্ঠী অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে একসময় দেশের পত্রিকায় তা একতরফাভাবে ছাপা হত। নব্বইয়ের দশকের শুরু ও শেষ দিকে পর্যায়ক্রমে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর প্রকাশনা শুরু হলে এ ধারায় একটা পরিবর্তন আসে।
পত্রিকা দুটি সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত ব্যক্তি, বা পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে তাদের বক্তব্যও ছাপানোর চর্চা শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে ও পরে প্রকাশনায় আসা অনেক পত্রিকা তা অনুসরণ করে আসছে। দুভার্গ্যজনক হচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রচারিত-প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে রাজধানী থেকে প্রকাশিত পাঠকনন্দিত একটি দৈনিক পত্রিকার শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্বরত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বক্তব্য প্রতিবেদনে প্রচার, প্রকাশ হলে তাদের নরমালাইজ করা হচ্ছে, এই অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মব করা হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে অনেক সময় বক্তব্য নেওয়া হয় না।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের অপমান করছে বাংলাদেশের ইতিহাসে সাংবাদিকদের ওপর সবচেয়ে বড় বিচারিক হয়রানি হতে দিয়ে।
তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ১৮ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও লজ্জাজনক বাস্তবতা হলো, অন্তত ২৯৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে—যার অনেকগুলোই হত্যার অভিযোগে—যেসব মামলায় তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্তই হয়নি, কিংবা আজ অব্দি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের কট্টর সমর্থক বা প্রচারক হওয়াটা অপরাধ নয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এসব মামলা 'হয়তো সরাসরি সরকারের নয়, বরং রাজনৈতিক দল বা অন্য রাজনৈতিক চরিত্রের সহায়তায় দায়ের করা হয়েছে।'
তার মতে, ‘অনেকেই আশা করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিস্তার লাভ করা যথেচ্ছ ও অন্যায় আটক রাখার সংস্কৃতি তাদের পতনের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটবে। কিন্তু তার বদলে দেখা যাচ্ছে, নতুন সরকার মুখে সংস্কারের যতই বুলি আওড়াক, এ পুরোনো দমনমূলক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না কিংবা হয়তো পারছে না।’
প্রসঙ্গত, আন্দোলনকারীদের একাংশের চাপ ও মবের ভয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মামুনকে (জ ই মামুন) ২০২৪ সালের আগস্টে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অব্যাহতির নোটিশ ১১ই আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।
জ ই মামুন ২০১৫ সাল থেকে এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এই টিভি চ্যানেলে যোগদানের আগে তিনি বেসরকারি আরেক টিভি চ্যানেল যমুনা টিভির বার্তা ও অনুষ্ঠান বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
খবরটি শেয়ার করুন