সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭শে মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইএএসডির জরিপে বিএনপি জোট ২০৮, জামায়াত জোট পেতে পারে ৪৬টি আসন *** নির্বাচন নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী—কে এগিয়ে? *** ‘৬ জনকে হত্যা করার কথা জানান র‍্যাব-ফেরত এক সেনা কর্মকর্তা’ *** পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে বিতর্ক, ‘পাশা’র প্রেমে প্রশ্নবিদ্ধ ইসি *** যানজটের কারণে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে সময়মতো অফিসারদের পাঠাতে পারিনি: ডিএমপি কমিশনার *** ডমিনিকার নাগরিকত্ব গ্রহণের অভিযোগ, নাহিদ ইসলামের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে রিট *** ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল নিতে বাধা নেই: ইসি সানাউল্লাহ *** ‘এবার কি জামায়াত আমিরের জিহ্বা হ‍্যাক হয়েছে?’ *** ‘দিল্লি হবে খালিস্তান’—বার্তা দিয়ে ভারতের সংসদ ভবন ও ৯ স্কুলে বোমা হামলার হুমকি *** পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের খবর: বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দেবে আইসিসি

পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে বিতর্ক, ‘পাশা’র প্রেমে প্রশ্নবিদ্ধ ইসি

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৫:২৯ অপরাহ্ন, ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

শায়লা শবনম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একদিকে নামসর্বস্ব ও সক্ষমতাহীন বলে চিহ্নিত পর্যবেক্ষক সংস্থা পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)-র নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমোদন স্থগিতের ঘোষণা, অন্যদিকে কমিশনের সেই সিদ্ধান্ত কার্যত উপেক্ষা করে ইসির জনসংযোগ (পিআর) শাখার পাঠানো নির্দেশনায় একই সংস্থার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকা—এই দ্বৈত অবস্থান কমিশনের ভেতরে ও বাইরে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত শনিবার (৭ই ফেব্রুয়ারি) সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সমালোচনার মুখে ‘পাশা’র ১০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষকের কার্ড বিতরণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংস্থাটির সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য আপাতত তাদের কার্ড ইস্যু বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু এর ঠিক একদিন পরই, রোববার (৮ই ফেব্রুয়ারি) ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল মল্লিক স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো তালিকায় দেখা যায়—‘পাশা’ এখনও পর্যবেক্ষক সংস্থার তালিকায় বহাল।

এই নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা–২০২৫ অনুসারে আসন্ন নির্বাচনে ইসিতে নিবন্ধিত ৮১টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নেবেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে ৭ হাজার ৯৯৭ জন এবং সংসদীয় আসনভিত্তিক স্থানীয়ভাবে ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন পর্যবেক্ষক রয়েছেন। কিন্তু এই মোট সংখ্যার মধ্যেই ‘পাশা’র ১০ হাজার ১২৯ জন স্থানীয় এবং ৪৩০ জন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—যা কার্ড স্থগিতের ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যদি ‘পাশা’র কার্ড বিতরণ স্থগিত হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বাদ না দিয়েই কীভাবে পর্যবেক্ষকের মোট সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে? একটি মাত্র সংস্থার প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যবেক্ষক তালিকা থেকে বাদ পড়লেও সংখ্যাগত সমন্বয় না হওয়া কি কেবল প্রশাসনিক অসতর্কতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীরতর কোনো সমন্বয়হীনতা?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল মল্লিক বলেন, “তালিকায় নাম থাকলেও বর্তমানে পাশার পর্যবেক্ষকদের কার্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে।” তবে এই ব্যাখ্যা বিভ্রান্তি কাটাতে পারেনি। কারণ মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য পাঠানো নির্দেশনাই যদি অস্পষ্ট হয়, তাহলে নির্বাচনকালীন সংবেদনশীল সময়ে তার বাস্তবায়ন কীভাবে সঠিকভাবে হবে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘পাশা’ সংস্থাটি নিয়ে এরই মধ্যে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা গেছে, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে অবস্থিত একটি বসতবাড়ির কক্ষই মূলত এই সংস্থার কার্যালয়। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীরই একমাত্র স্থায়ী ব্যক্তি। নেই কোনো প্রকল্প, নেই প্রশিক্ষিত জনবল, এমনকি এনজিও ব্যুরোর কার্যকর অনুমোদনও নেই—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।

অথচ এই নামসর্বস্ব সংস্থাটিই এবারের নির্বাচনে ১২৭টি সংসদীয় আসনে পর্যবেক্ষক মোতায়েনের অনুমতি পেয়েছিল। মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় কোনো কোনো আসনে শতাধিক পর্যবেক্ষক একাই ‘পাশা’ থেকে অনুমোদন পেয়েছে। অন্য কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থার ক্ষেত্রে এমন বিপুল সংখ্যার নজির নেই।

সমালোচকদের মতে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন একটি সংস্থাকে দেওয়ার সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে, পর্যবেক্ষক অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইসি প্রয়োজনীয় মাঠপর্যায়ের যাচাই–বাছাই করেনি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এতে বোঝা যাচ্ছে, ইসি কাগজে–কলমে শর্ত পূরণ দেখেই অনুমোদন দিয়েছে। বাস্তবে সংস্থাগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা হয়নি, যা ইসির সক্ষমতার ইতিবাচক প্রতিফলন নয়।”

এই প্রথম নয়—এর আগেও নির্বাচন পর্যবেক্ষক নিয়ে বিতর্কে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম ও সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাগুলো বিতর্কিত নির্বাচনের পক্ষে ‘সার্টিফিকেট’ দেওয়ার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছিল। এমনকি বিদেশি পর্যবেক্ষক পরিচয়ে আনা কিছু ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল, যা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়।

এবারের প্রেক্ষাপট আরও সংবেদনশীল। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা তুঙ্গে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও অন্তর্বর্তী সরকার বারবার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশ্বাস দিচ্ছে। এমন সময়ে পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে এই ধরনের সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

পর্যবেক্ষক কার্ড ইস্যু নিয়ে ইসির সর্বশেষ নির্দেশনায় বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও ফরম যাচাইয়ের মতো কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে—যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রশ্ন হলো, এসব শর্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের ওপর, সেই প্রশাসনিক কাঠামোই যদি বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা পায়, তাহলে নীতিমালার কার্যকারিতা কতটুকু নিশ্চিত হবে?

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা। ‘পাশা’র মতো বিতর্কিত সংস্থার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান দ্ব্যর্থহীনভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কার্ড স্থগিত মানে শুধু কাগজে–কলমে সিদ্ধান্ত নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করা। অন্যথায়, এই ‘পাশা–পর্ব’ কেবল একটি সংস্থার বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরই আস্থার সংকট তৈরি করবে।

নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা দরকার—পর্যবেক্ষক শুধু সংখ্যার খেলা নয়, তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নৈতিক সাক্ষী। সেই সাক্ষীরা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হন, তবে নির্বাচনের ফল যতই ‘আইনসম্মত’ হোক না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। এখনো সময় আছে—সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে কমিশন চাইলে সেই আস্থার জায়গাটি পুনরুদ্ধার করতে পারে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250