ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ই নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের যে রায় ঘোষণা করেছেন, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান। তার মতে, পশ্চিমা দেশগুলো এ ধরনের বিচারকে পুরোপুরি সমর্থন করবে না। যারা এই বিচারকে ‘অবৈধ’ বা ‘রাজনৈতিক’ বলতে চাইছেন, রায়ের পর তাদের যুক্তি আরও শক্তিশালী হলো এবং এখানে আন্তর্জাতিক অপরাধসহ বড় মামলায়ও ন্যায়সংগত বিচার হয় না বলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আছে, এই রায়ে সেটি আরও পোক্ত হলো।
অর্থাৎ, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর দেশের ভাবমূর্তি আরো প্রশ্নবিদ্ধ হলো, ‘ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার’ ও ‘ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া’—দুটি আলাদা বিষয়। তবে আদালতের রায় বাংলাদেশের ভেতরে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে বলেও তার অভিমত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আসলে কেমন রাষ্ট্র হতে চায় আর এর বিচারব্যবস্থাকে কেমন দেখতে চায়, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নটি জড়িত। তবে আদালতে ‘স্বাধীনতার অভাব’ ছিল—এমন দাবি করার জন্য যথেষ্ট জোরালো যুক্তি রয়েছে। যদি না থাকত, তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এত বড় এবং জটিল একটি মামলার ক্ষেত্রে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং রায় ঘোষণার এই ‘নজিরবিহীন দ্রুততা’ ‘ন্যায্য বিচার সংক্রান্ত উদ্বেগ’ সৃষ্টি করত না।
তার মতে, আদালতের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা আসামি পক্ষের আইনজীবীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যে ‘সময় দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত’। শেখ হাসিনার বিচার কতটা ন্যায়সংগত হচ্ছে, বা সঠিক প্রক্রিয়া মেনে বিচার হয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন তুললেই যেন অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, মনে করা হচ্ছে, বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানে হলো, ‘প্রাপ্য বিচার’ থেকে তাদের বাঁচানোর চেষ্টা। এই ‘অন্যায্য বিচারের সূচকগুলো’ আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন এই মর্মে খবর পাওয়া যায় যে, ‘আসামি পক্ষের আইনজীবীকে পরস্পর-বিরোধী বলে গণ্য হওয়া সাক্ষ্যের জেরা করার অনুমতিই দেওয়া হয়নি’। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যথার্থই বলেছে যে, এর ফলে বিষয়টা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত 'শেখ হাসিনার বিচার: ন্যায়বিচার বনাম ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন' শিরোনামের এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ রোববার (৩০শে নভেম্বর) প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। তার দাবি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার’ কথাটি ‘ন্যায়সংগত বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ থেকে আলাদা করে দেখা হয়।
নিজের কলামে বার্গম্যান বলেন, প্রথমত, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে এ ক্ষেত্রে (শেখ হাসিনার বিচার) খুব সীমিত সমর্থন মিলবে। এ ধরনের বিচারকে তারা পুরোপুরি সমর্থন করবে না। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ পাওয়ার সম্ভাবনা এখন শূন্য। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের মধ্যে যারা এই বিচারকে ‘অবৈধ’ বা ‘রাজনৈতিক’ বলতে চাইছেন, এতে তাদের যুক্তি আরও শক্তিশালী হলো এবং এখানে আন্তর্জাতিক অপরাধসহ বড় মামলায়ও ন্যায়সংগত বিচার হয় না বলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আছে, এই রায়ে সেটি আরও পোক্ত হলো।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আরও বিচার চলার সময়, সরকার ও আদালতকে বারবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করায় কতটা গুরুত্ব দিতে হবে, আর পুরোপুরি ন্যায্য ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করায় কতটা গুরুত্ব দিতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বা সমঝোতা করাই তাদের সিদ্ধান্তের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, আদালতে ‘স্বাধীনতার অভাব’ ছিল—এমন দাবি করার জন্য যথেষ্ট জোরালো যুক্তি রয়েছে। যদি না থাকত, তবে এত বড় এবং জটিল একটি মামলার ক্ষেত্রে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং রায় ঘোষণার এই ‘নজিরবিহীন দ্রুততা’ ‘ন্যায্য বিচার সংক্রান্ত উদ্বেগ’ সৃষ্টি করত না। উপরন্তু, আদালতের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা আসামি পক্ষের আইনজীবীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যে ‘সময় দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত’।
তিনি লেখেন, এই ‘অন্যায্য বিচারের সূচকগুলো’ আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন এই মর্মে খবর পাওয়া যায় যে, ‘আসামি পক্ষের আইনজীবীকে পরস্পর-বিরোধী বলে গণ্য হওয়া সাক্ষ্যের জেরা করার অনুমতিই দেওয়া হয়নি’ বলে জানা গিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যথার্থই বলেছে যে এর ফলে বিষয়টা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
ডেভিড বার্গম্যান বলেন, বাংলাদেশ আসলে কেমন রাষ্ট্র হতে চায় আর এর বিচারব্যবস্থাকে কেমন দেখতে চায় তার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নটি জড়িত। সরকার মনে করেছে, ‘ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে গেলে পুরোপুরি আইনানুগ ও নিরপেক্ষ বিচার করলে সেটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, বা অন্তত বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই দ্বিধার মুখে সরকার স্পষ্টভাবেই ভুক্তভোগীদের ‘ন্যায়বিচার’ (অর্থাৎ আসামির জন্য কঠোর শাস্তি)-কেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন