সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চার এসপিকে বদলি-পদায়ন *** এমপি নজরুলের গ্রেপ্তারে স্পিকারকে চিঠি দিচ্ছে পুলিশ, দ্বিতীয় স্ত্রীর চিরকুটের তদন্ত চলছে *** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন

সুখবর এক্সপ্লেইনার

২৮০ দিন ধরে বিনা বিচারে কারাগারে খায়রুল হক: আইনের শাসন, না বিচার-পূর্ব শাস্তি?

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:১৭ অপরাহ্ন, ২৯শে এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দীর্ঘ ২৮০ দিনের কারাবাস একটি নজিরবিহীন এবং গভীরভাবে বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। একজন ব্যক্তি, যিনি একসময় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি যদি কোনো মামলায় বিচার শুরু হওয়ার আগেই দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে থাকেন, তবে তা নিছক একটি আইনি বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং বিচারিক স্বাধীনতার একটি বড় পরীক্ষাও।

বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী খায়রুল হকের বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা মামলা, জালিয়াতির অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত কোনো মামলাতেই পুলিশ চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি। অর্থাৎ, তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, এবং বিচার কার্যক্রমও শুরু হয়নি।

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না; বরং আদালতে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হন। এই মৌলিক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে—বিচার শুরুর আগেই প্রায় নয় মাস কারাবন্দি থাকা কি আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নাকি এটি কার্যত বিচার-পূর্ব শাস্তিরই একটি রূপ?

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচটি মামলায় খায়রুল হকের জামিন বহাল রেখেছেন। এর আগে হাইকোর্টও চারটি মামলায় তাকে স্থায়ী জামিন দিয়েছিলেন। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলাতেও তিনি জামিন পেয়েছেন। তবুও তিনি কারাগারে—কারণ অন্য দুটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এই পরিস্থিতিকে আইনজ্ঞরা “চেইন অ্যারেস্ট” বা ধারাবাহিক গ্রেপ্তার কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আইনজীবীদের ভাষায়, ড়“একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আটক রাখা হয়। এতে করে কার্যত জামিনের সুবিধা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।”

খায়রুল হকের আইনজীবীরা ২০১৬ সালে বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমানের মামলার রায়ের নজির তুলে ধরেন। সেই রায়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ বলেছিলেন—বিচারের আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জেলে রাখা উচিত নয়।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ (১) ধারা অনুযায়ী, জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বয়স, স্বাস্থ্য ও অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনা করা উচিত। শফিক রেহমানের বয়স ও অসুস্থতার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাকে জামিন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই যুক্তি খায়রুল হকের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে একজন আইন গবেষক বলেন, “আইন একই হলেও প্রয়োগে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। এটি বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।”

খায়রুল হক হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। একজন ৮১ বছর বয়সী ব্যক্তির জন্য দীর্ঘ কারাবাস স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি বাড়ায়। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা যেমন জামিন বা গৃহবন্দি বিবেচনা করা উচিত। এখানে সেই মানবিক দিকটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।”

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সাবেক আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত রায়। ২০১১ সালে তার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন—যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনে এবং বিতর্কের জন্ম দেয়।

পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সেই রায় বাতিল করেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—একটি বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য কি কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে? হাইকোর্ট ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, এই অভিযোগগুলো বিচারিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে উদ্ভূত হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে বিচারপতিদের একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বিচারিক দায়মুক্তি দেওয়া হয়, যাতে তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

একজন সাবেক বিচারপতির মতে, “যদি বিচারিক রায়ের জন্য বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিচারিক স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” খায়রুল হকের দেওয়া রায়গুলো, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো অনেকের কাছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মনে হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “বাংলাদেশে আইন ও রাজনীতি প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে কোনো বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হলে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।” তবে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত নয়, এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে।

সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সব কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা করতে বাধ্য। কিন্তু যখন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতিই দীর্ঘদিন বিচারবিহীন অবস্থায় কারাগারে থাকেন, তখন এই সাংবিধানিক আদর্শ বাস্তবে কতটা কার্যকর—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে তিনটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি: আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং বিচারিক স্বাধীনতা বজায় রাখা। আইনজীবীরা বলছেন, “অভিযোগ গুরুতর হলেও, বিচার শুরুর আগেই দীর্ঘদিন আটক রাখা ন্যায়বিচারের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতকে এখানে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।”

খায়রুল হকের ২৮০ দিনের কারাবাস কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়—এটি দেশের বিচারব্যবস্থার একটি দৃষ্টান্তমূলক পরীক্ষা। এখানে আইনের শাসন, মানবিকতা, এবং বিচারিক স্বাধীনতা—সবকিছুই একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

সবশেষে বলা যায়, ন্যায়বিচারের মূল কথা শুধু বিচার হওয়া নয়, বরং তা সময়মতো ও দৃশ্যমানভাবে নিশ্চিত হওয়া। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রেই যদি এই প্রশ্নগুলো অনির্দিষ্ট থেকে যায়, তবে সাধারণ নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা কতটা শক্ত—সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।

এ বি এম খায়রুল হক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250