ছবি: সংগৃহীত
অভিনেতা ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে হত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তবে ওই অভিযোগপত্রে তাকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। এমনকি অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত ছয়টি ভিডিওর কোনোটিতে তার বক্তব্য বা উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি। যে হত্যাকাণ্ডে তাকে প্ররোচনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেটি ঘটেছে রাজধানীর বাড্ডায়। অথচ তার নির্বাচনী এলাকা নীলফামারীতে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কেউ নিহত হননি। এ অবস্থায় নূরের বিরুদ্ধে হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ কীসের ভিত্তিতে আনা হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ডেভিড বার্গম্যান।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক কলামে এসব প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ‘প্রমাণ ছাড়াই হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত কলামটিতে আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগপত্রের বিভিন্ন অসংগতি, তদন্তের দুর্বলতা এবং জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই সাংবাদিক।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে আজ আসাদুজ্জামান নূরের ৮০তম জন্মদিন হওয়ায়। একদিকে তার জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাচ্ছেন ভক্ত, অনুরাগী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং নাট্যাঙ্গনের বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পীরা। অন্যদিকে নতুন করে সামনে এসেছে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। কারাগারে থাকা এই অভিনেতার জন্মদিনে তার পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের শুভেচ্ছাবার্তার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবিও আলোচনায় এসেছে।
প্রথম আলোর কলামে ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন, সপ্তাহের শুরুতে আসাদুজ্জামান নূরের মেয়ে সুপ্রভা তাসনিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানতে পারেন, তার বাবার বিরুদ্ধে হত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ এ ধরনের কোনো মামলার বিষয়ে তিনি আগে জানতেন না। মামলাটিতে নূরকে গ্রেপ্তারও দেখানো হয়নি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এজাহারের পাশাপাশি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রেও তার নাম রয়েছে।
অভিযোগটি ২০২৪ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় প্রাইভেটকারচালক ইমদাদুল হক হত্যাকাণ্ডের। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটনে নূরের অনুসারীরা ভূমিকা রেখেছিলেন। আর তাদের কর্মকাণ্ডে প্ররোচনা দিয়েছিলেন আসাদুজ্জামান নূর।
কিন্তু ২৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে ডেভিড বার্গম্যানের পর্যবেক্ষণ, নূরকে হত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করার মতো কোনো প্রমাণ সেখানে নেই। অভিযোগপত্রে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কারা নূরের অনুসারী, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এখানেই তদন্তের একটি বড় অসংগতি দেখিয়েছেন বার্গম্যান।
আসাদুজ্জামান নূর ঢাকার কোনো সংসদ সদস্য ছিলেন না। তিনি নীলফামারী-২ আসন থেকে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে বাড্ডার কোনো ভৌগোলিক বা স্থানীয় সাংগঠনিক সম্পর্ক অভিযোগপত্রে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। বরং বাড্ডার মামলায় নাম থাকা ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর অধিকাংশই বাড্ডা কিংবা ঢাকার আশপাশের ওয়ার্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
বার্গম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নূরের নির্বাচনী এলাকা নীলফামারীতে কেউ নিহত হননি। ফলে ঢাকার বাড্ডায় সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডে নীলফামারীর সংসদ সদস্যকে প্ররোচনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করার পেছনে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
শুধু অনুসারীদের উপস্থিতি নিয়েই প্রশ্ন নয়, হত্যায় প্ররোচনার আইনি উপাদানও অভিযোগপত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মনে করেন এই সাংবাদিক। তার মতে, কোনো ব্যক্তিকে হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে হলে প্রমাণ করতে হবে, তিনি অপরাধ সংঘটনে উসকানি দিয়েছেন, অপরাধে সহায়তা করেছেন অথবা ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু নূরের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সংশ্লিষ্টতা অভিযোগপত্রে দেখানো হয়নি।
অভিযোগপত্রে ছয়টি ভিডিওর উল্লেখ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্য। কিন্তু এসব ভিডিওর কোনোটিতে আসাদুজ্জামান নূরের বক্তব্য নেই। এমনকি কোনো ভিডিওতে তাকে দেখা যায়নি কিংবা তার নামও উল্লেখ করা হয়নি।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও কাটিংয়ের সঙ্গেও নূরের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে লিখেছেন বার্গম্যান। অর্থাৎ অভিযোগের পক্ষে যেসব উপাদান উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই তাকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে না।
তদন্তের আরও কয়েকটি গুরুতর দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। অভিযোগপত্রে ঘটনার দিনের বাড্ডা এলাকার কোনো ভিডিওচিত্র বা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজের উল্লেখ নেই। ফলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর উপস্থিতিও যাচাই করা যায়নি। নিহত ইমদাদুল হকের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। গুলি ছোড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক বা ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়নি। কোনো অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়নি। এমনকি নিহত ব্যক্তিকে প্রথমে যে এ এম জেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানকার চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিও অভিযোগপত্রে নেই।
অথচ তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূল এজাহারে নাম থাকা ৬৭ জনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বাড্ডার ৩৭ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের দুজন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর। বার্গম্যানের প্রশ্ন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের এসব নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হলেও নীলফামারীর সাবেক সংসদ সদস্য নূরের বিরুদ্ধে কীসের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হলো?
তার মতে, এটি কেবল আসাদুজ্জামান নূরের ব্যক্তিগত মামলার প্রশ্ন নয়। হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত আরও ১৫ জনের অনেকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় মনে হয়েছে।
জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে বার্গম্যানের সমালোচনা আরও বিস্তৃত। তিনি মনে করেন, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের কিছু রাজনীতিক ও কর্মীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার যথেষ্ট প্রমাণও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থককে একইভাবে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে অর্থবহ কোনো প্রমাণ নেই।
বর্তমান বিএনপি সরকারের সমর্থনপুষ্ট বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা বিচারপ্রক্রিয়াকে স্বেচ্ছাচারী করে তুলছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লাগতে পারে। এ সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিন পাওয়ার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এদিকে আজ ৩১ অক্টোবর আসাদুজ্জামান নূরের জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন নাট্যাঙ্গনের সহকর্মী ও ভক্তরা। অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেনও তার জন্মদিনে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। চ্যানেল আই অনলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নূরের জন্মদিন উপলক্ষে আফজাল হোসেন তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। নূরের পুত্রবধূ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরিন ইসলামও শ্বশুরের জন্মদিনে আগের একটি পোস্ট পুনরায় শেয়ার করেছেন।
১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর নীলফামারীতে জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান নূর। মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও আবৃত্তিতে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অর্জন করেছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকে বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় তাকে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নীলফামারী-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৪ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার।
২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বেইলি রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন নূর। এরপর জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক একাধিক হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এবং আইনি জটিলতায় তার মুক্তি আটকে রয়েছে।
ডেভিড বার্গম্যান বাংলাদেশের রাজনীতি, মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করছেন। তিনি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে ডেইলি স্টার, নিউ এজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। বিশেষ করে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সাক্ষ্যপ্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তার অনুসন্ধান ও সমালোচনা আলোচিত হয়েছে। প্রথম আলোর আজকের কলামটিও সেই ধারার অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। একইভাবে জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত ও বিচার করতে হবে। ডেভিড বার্গম্যানের কলামটি সেই মৌলিক প্রশ্নই সামনে এনেছে—একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনার পরও যদি অভিযোগপত্রে তার অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেই অভিযোগপত্রের ভিত্তি কী?
খবরটি শেয়ার করুন