ছবি: সংগৃহীত
ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে পাল্টা পোস্ট দিয়েছেন ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাদাত হোসেন। গতকাল শনিবার রাতে শাহাদাত হোসেন তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘প্রচলিত প্রবাদ আছে পাগলে কিনা বলে, ছাগলে কিনা খায়। চোরের মায়ের বড় গলা। বুঝলে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা।’ তার এই পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
দলীয় দুই নেতার এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ঝালকাঠি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা বিভাজনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্য যখন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নানা অভিযোগ তুলেছেন এবং এর পরপরই জেলা বিএনপির শীর্ষ এক নেতা ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় পাল্টা পোস্ট দিয়েছেন, তখন বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও কৌতূহল তৈরি করেছে।
সম্প্রতি রফিকুল ইসলাম জামাল তার ফেসবুক পোস্টে ঝালকাঠির বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, ‘ছয় মাসে অনেক খেয়েছেন।’ এরপর তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাহারা দেওয়ার বিনিময়ে, তাদের পক্ষে ওকালতি করে, বাড়িঘর ও ঠিকাদারি পাহারা দিয়ে এবং বিভিন্ন মামলায় আসামি না দেওয়ার বিনিময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী সুবিধা নিয়েছেন।
এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের লোকজনকে বিএনপিতে যোগদান করানোর অভিযোগও তোলেন তিনি। একপর্যায়ে রফিকুল ইসলাম জামাল লেখেন, ‘মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন।’
একই পোস্টে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে তাদের এত কিছু পাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেই জুলাই শহীদদের জন্যও তারা একটু দোয়া-মোনাজাত করতে পারেননি।
রফিকুল ইসলাম জামাল ঝালকাঠি-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি ৬২ হাজার ১০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ফয়জুল হক পেয়েছিলেন ৫৫ হাজার ১২০ ভোট। আসনটি রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত।
নির্বাচনের আগে ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছিল। নির্বাচনে এ আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
রফিকুল ইসলাম জামালের পোস্টের পর শনিবার রাতে শাহাদাত হোসেনের দেওয়া পোস্টটি রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন মাত্রার আলোচনা তৈরি করে। তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ কথাটি লেখায় অনেকেই এটিকে এমপির পোস্টের পাল্টা বক্তব্য হিসেবে দেখছেন। তবে শাহাদাত হোসেন নিজে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাদাত হোসেন মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ‘আমি আসলে কাউকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক মাধ্যমে এসব লিখিনি। এখন যদি কেউ এটা নিজের গায়ে টেনে নেয়, সে দায়িত্ব তো আমার না।’
তার বক্তব্যের পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা থামেনি। কেউ কেউ দুই নেতার প্রকাশ্য বক্তব্যকে দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
ঝালকাঠির স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। তবে সংসদ সদস্য ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতার মধ্যে এমন বক্তব্য প্রকাশ্যে চলে এলে সেটি সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নতুন সরকার ও নতুন সংসদ গঠনের পর দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম যখন নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, তখন স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার আরেকটি দিক হলো—রফিকুল ইসলাম জামালের পোস্টে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনোটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনার নাম উল্লেখ করে দেওয়া হয়নি। ফলে কার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ, সেটি স্পষ্ট নয়। একইভাবে শাহাদাত হোসেনের পোস্টেও কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে দুই নেতার বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও অনুমানই বেশি দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, অভিযোগ থাকলে তা দলের সাংগঠনিক ফোরামে আলোচনা করা উচিত। প্রকাশ্যে পাল্টাপাল্টি পোস্ট না দিয়ে দলীয়ভাবে বিষয়গুলোর তদন্ত ও সমাধান করা হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন থাকবে। অন্যদিকে আরেক অংশের বক্তব্য, অনিয়ম বা দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা প্রকাশ্যে আসাও প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় কেউ এমপির বক্তব্যকে ‘দলের ভেতরের বাস্তবতা তুলে ধরার সাহসী উদ্যোগ’ বলে মন্তব্য করছেন, আবার কেউ পাল্টা পোস্টকে ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে দেখছেন। তবে এসব প্রতিক্রিয়ার কোনোটিকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, রফিকুল ইসলাম জামালের অভিযোগপূর্ণ পোস্ট এবং তার পরদিন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাদাত হোসেনের ইঙ্গিতপূর্ণ পাল্টা পোস্ট ঝালকাঠির বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তবে দুই নেতার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বিরোধ কতটা সাংগঠনিক পর্যায়ে বিস্তৃত এবং এর প্রভাব দলীয় কর্মকাণ্ডে কতটা পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যাও এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি।
খবরটি শেয়ার করুন