ছবি: সংগৃহীত
টাঙ্গাইলের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠর আবক্ষ ভাস্কর্যের গলায় দড়ি বেঁধে মেলার স্টল নির্মাণের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) আয়োজিত এক মেলার শেষ দিনে এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। রোববার রাতে ভাস্কর্যের গলায় দড়ি বাঁধা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় নিন্দা ও ক্ষোভ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানজুড়ে অস্থায়ী স্টল নির্মাণ করা হয়। উদ্যানে স্থাপিত সাত বীরশ্রেষ্ঠর ভাস্কর্যের সামনেও একইভাবে স্টল বসানো হয়। গত ২৪ এপ্রিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মেলার উদ্বোধন করেন। নয় দিনব্যাপী এই মেলার শেষ দিনে তোলা একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হলে বিষয়টি সামনে আসে।
ছবিতে দেখা যায়, স্টলগুলোর ছাউনি টানানোর জন্য ব্যবহৃত দড়ি সরাসরি বীরশ্রেষ্ঠদের আবক্ষ ভাস্কর্যের গলায় বেঁধে রাখা হয়েছে। দড়িতে ঝুলছে কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য, আর ভাস্কর্যের পাশেই জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। এমন দৃশ্য অনেকের কাছেই বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আল আমীন খান নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘বীরের গলায় মেলার দড়ি! এ লজ্জা কি শুধু টাঙ্গাইলবাসীর?’ উদীচীর টাঙ্গাইল জেলা সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর নাসিমুল ইসলাম লিখেছেন, ‘ছবিতে দেখুন বীরশ্রেষ্ঠদের গলায় বাঁধা মেলার স্টলের দড়ি। সেই দড়িতে ঝুলছে কাপড়। পাশে ময়লার স্তূপ। এটা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, এটা ইতিহাসের অপমান। যারা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করলেন, তাদের গলায় আমরা দড়ি বাঁধছি।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আল আমীনও ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘যাদের রক্তে এই দেশ স্বাধীন হলো, মেলার ব্যবসার জন্য আজ তাদের গলায় দড়ি। মেলা কর্তৃপক্ষ আর প্রশাসনের চোখে কি ধুলো-বালি পড়েছে?’
এ ছাড়া আরও অনেক নেটিজেন বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মাহমুদুল হাসান নামের একজন লিখেছেন, ‘এটা শুধু অবহেলা নয়, চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। যারা স্টল দিয়েছে এবং যারা তদারকি করেছে—দুই পক্ষেরই জবাবদিহি দরকার।’ রুবাইয়া রহমান নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘আমরা কি আমাদের ইতিহাসকে এতটাই অবমূল্যায়ন করি? এমন ঘটনা দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী শিখবে?’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। অনেকে মনে করছেন, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের স্মৃতিচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষায় অবহেলার একটি প্রতিফলন।
সরকারি এম এম আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ শামসুল হুদা বলেন, বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য আড়াল করে স্টল নির্মাণ করা ঠিক নয়। তার ওপর স্টলের দড়ি টানানো হয়েছে ভাস্কর্যের গলায়—এটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে এমন যাতে না হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন হতে হবে।’
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে বিসিকের টাঙ্গাইল জেলার সহকারী মহাব্যবস্থাপক শাহনাজ বেগম বলেন, মেলার ৯ দিনের মাথায় কে বা কারা এ কাজ করেছেন, তা তার জানা নেই। তবে বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে দড়ি খুলে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি।’
ইতিহাসবিদ ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতীয় বীরদের স্মৃতিচিহ্নের প্রতি এমন অবহেলা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং জাতীয় চেতনার পরিপন্থী। বীরশ্রেষ্ঠরা আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। তাদের স্মৃতির প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।’
সাংস্কৃতিক কর্মী সায়মা নাসরিন বলেন, ‘মেলা আয়োজন অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু তা করতে গিয়ে যদি ইতিহাসকে অপমান করা হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আরও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।’
টাঙ্গাইলের সচেতন নাগরিকদের অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে ঐতিহাসিক ও স্মৃতিবাহী স্থানে কোনো অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন—এটি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হওয়াই এখন সময়ের দাবি।
খবরটি শেয়ার করুন