বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কওমি মাদ্রাসায় নির্যাতন ঠেকাতে সুরক্ষা কমিটি ও হটলাইন চালুসহ যেসব নির্দেশনা *** জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী *** জামায়াতকে ‘লংমার্চ’ স্থগিতের অনুরোধ শাহবাজের, দিলেন যে প্রস্তাব *** ‘শেখ হাসিনা কেন এখনো এনডিটিভির চোখে প্রধানমন্ত্রী’ *** গাজী নজরুলের এমপি পদ থাকবে কি না, সিদ্ধান্ত পুলিশের ব্যবস্থা দেখে *** এত কিছুর পরেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকে কীভাবে: টিআইবি *** ঋণ পরিশোধ না করায় মেসির নতুন ক্লাবের শেয়ার জব্দ *** লঞ্চভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব *** বর্তমান সরকারের জন্য এয়ারবাস হলো ‘পরীক্ষা’: ফরাসি রাষ্ট্রদূত *** আসাদ আলম সিয়ামকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার করার সিদ্ধান্তে সম্মতি ভারতের

কওমি মাদ্রাসায় নির্যাতন ঠেকাতে সুরক্ষা কমিটি ও হটলাইন চালুসহ যেসব নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১১:৩২ অপরাহ্ন, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে দেশের ৬টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।

নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের শাস্তির জন্য প্রহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া, অভিযোগ গ্রহণের জন্য মাদ্রাসাগুলোতে পৃথক হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে হবে। কোনো মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, নিষ্ক্রিয় থাকা বা অভিযোগ পেয়েও ব্যবস্থা না নেওয়া প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইলহাক (অধিভুক্তি) স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে আল-হাইআতুল উলয়ার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

গত ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাব-কমিটির সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের আলোকে এসব নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

নির্দেশনা তৈরিতে আশরাফ আলী থানভী, মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ ওলামায়ে দেওবন্দের শিক্ষা ও তারবিয়াতবিষয়ক রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীকে শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে তার সংশোধন ও কল্যাণ, প্রতিশোধ নয়। রাগের অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।

শিক্ষার্থীকে শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা এবং এরপর রাগ-ধমকের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। একান্ত প্রয়োজন হলে সর্বশেষ ধাপে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়ে অভিভাবকসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো অবস্থাতেই শাস্তি হিসেবে শিক্ষার্থীকে প্রহার করা যাবে না।

লাঠি, বেত বা কোনো ধরনের যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টি হয়—এমন যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

একইসঙ্গে প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষা, ঘৃণাসূচক নামে ডাকা এবং অন্য যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও বিধি—উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে আল-হাইআতুল উলয়া।

প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগ পাওয়ার পর ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

কোনো মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকা অথবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হতে পারে বলে বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য প্রতিটি মাদ্রাসায় নিয়মিত ইসলাহী মজলিশ আয়োজনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিশ এবং অভিভাবক-সমাবেশ আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে।

মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রতিটি বোর্ডে পৃথক ‘মাদ্রাসা মনিটরিং সেল’ গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কোনো অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। 

শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের সময় প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে বোর্ডগুলোকে বলা হয়েছে।

প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন নম্বর ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ)-এ যোগাযোগ করা যাবে।

আল-হাইআতুল উলয়া বলেছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে পুরো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা ব্যক্তির অপরাধের দায় মাদ্রাসা, বোর্ড বা সামগ্রিক আলেম-উলামা ও ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংগত নয় বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আল-হাইআতুল উলয়া বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডের অধীনেই কেন্দ্রীয়ভাবে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই বোর্ড একজন চেয়ারম্যান ও একজন কো-চেয়ারম্যান সহ ৩২ জন সদস্য নিয়ে গঠিত।

এই বোর্ড অর্থাৎ পরিচালনা কমিটির তেমন একজন সদস্য মুসলেহ উদ্দিন রাজু বলেন, আল-হাইআতুল উলয়া সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করে না, ছয়টি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব বোর্ডের সমন্বয়ে বিভিন্ন নীতিমালা তৈরি করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা তদারকিতে প্রত্যেক বোর্ডের নিজস্ব পরিদর্শক দল রয়েছে।

তিনি বলেন, এসব পরিদর্শক সারা বছর বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা পরিদর্শন করে এবং কয়েকশ ব্যক্তি এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় মাদ্রাসার প্রধানদের নিয়ে নিয়মিত সভা করা হয়, যেখানে নির্দেশনা ও নীতিমালার বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এভাবেই নির্দেশনাগুলো কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে।

‘সুরক্ষা কমিটি’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টি কওমি মাদ্রাসাগুলোতে আগে থেকেই বিভিন্ন কমিটি ও নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ও মাসিক সভা এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ‘সুরক্ষা কমিটি’ নামটি নতুন করে ব্যবহার করা হয়েছে, যেন বিষয়টি গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য হয়।

তিনি জানান, বর্তমানে ছয়টি বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। এর ভেতর শুধু বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা নিবন্ধিত রয়েছে।

কওমি মাদ্রাসা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250