ছবি: সংগৃহীত
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জ ই মামুন বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের, এই দেশের প্রতিটি মানুষের পরিচয়। কিন্তু এই পরিচয়কে মুছে দিতে সব অপকৌশলই প্রয়োগ করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের কোনো চিহ্ন তারা এই দেশে রাখবে না। সেই ধারাবাহিকতায় সবশেষ যুক্ত হলো বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ভাস্কর্য। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের জন্মস্থানে স্থাপিত এই ভাস্কর্য ভাঙার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে রাস্তা বড় করার কথা।
তিনি বলেন, আরে বাবা, তুমি ইন্টেরিম সরকার। তুমি এসেছো সংস্কার-টংস্কার আরো কী কী যেন করতে, সেগুলো করো। বিদায় বেলায় রাস্তা বড় করার তোমার কি দরকার? তিন সপ্তাহ পরে দেশে নির্বাচন, এসব উন্নয়ন কাজ নির্বাচিত সরকারকে করতে দাও। জ ই মামুন তার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আজ বৃহস্পতিবার (২২শে জানুয়ারি) দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা বলেন। তার এই স্ট্যাটাস ফেসবুকে এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, কিন্তু কথা সেটা না, আসল কথা হলো মুক্তিযুদ্ধের কোনো চিহ্ন এরা এই দেশে রাখবে না। প্রথম আলো রিপোর্ট করেছে, ২০২৪ সালের ৫ই থেকে ১৪ই আগস্টের মধ্যে দেশে দেড় হাজার ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে, যার অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে নির্মিত। মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের সকল ভাস্কর্য মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মৃতি বিজড়িত স্বাধীনতা জাদুঘরের যাবতীয় ভাস্কর্য। এছাড়া সারা বাংলাদেশে, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত কোথাও মুক্তিযুদ্ধের কোনো ভাস্কর্য আর অক্ষত আছে বলে মনে হয় না।
তিনি লেখেন, রাজধানীর বিজয় সরণিতে “মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ” বলে একটা ভাস্কর্য এবং ম্যুরালের নান্দনিক সমন্বয় ছিল। সেখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ দেশের মানুষের সকল সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুন মাসে ড. ইউনূস সরকার সেটি ভেঙে ফেলে। বলা হয়, সেখানে জুলাই গণমিনার করা হবে। তখনও বলেছি আবারও বলি, গণমিনার করা উদ্দেশ্য না, উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা। গণমিনার বা নতুন কিছু করেত চাইলে অন্য অনেক জায়গায় করা যায়, মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ ভেঙে সেখানেই কেন করতে হবে?
জ ই মামুন বলেন, বর্ষার নতুন পানির কই মাছের মতো হালে উজানো একটি দল আছে, তারা ভাস্কর্য ম্যুরাল এসবকে ইসলাম বিরোধী, হারাম ফতোয়া দিয়ে ভেঙে ফেলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। কিন্তু গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বানিয়ে সেখানে যখন মানুষের ভাস্কর্য বা মূর্তি স্থাপন করা হয়, তখন তারা চুপ থাকে। তখন এই ভাস্কর্যকে তাদের কাছে হালাল মনে হয়। এই দল সম্পর্কে সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “এরা হলো বেঈমান, এরা মুনাফেক।”
তিনি বলেন, প্রশ্ন হচ্ছে, স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙলেই কি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে? এই প্রসঙ্গে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের “স্মৃতিস্তম্ভ” কবিতার কথা মনে পড়ে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার পাকিস্তানিরা ভেঙে ফেলার পর তিনি লিখেছিলেন এই কবিতা, যা আজকের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।
“স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু,
আমরা এখনো চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো!
যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটকা ধুলায় চূর্ণ যে পদ-প্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক!
ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার।”
খবরটি শেয়ার করুন