ছবি: প্রথম আলো
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাও বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে বলে মনে করেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তার মতে, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে একটি প্রকৃত স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু সংবিধানে এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনলেই হবে না, নির্বাচনকালীন সরকারের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকর ক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাসীন দলকে সম্মত হতে হবে, যার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের এক বছরও পার হয়নি। এরই মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা কেন প্রয়োজন, সেই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ আনাম। তার মতে, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন রাজনৈতিক বিরোধ ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। বিপরীতে, স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে পরাজিত দলগুলোর আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত এক কলামে এসব কথা লিখেছেন মাহফুজ আনাম। ‘অনলি অ্যান ইনডিপেনডেন্ট কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ক্যান ইনশিওর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশনস’ শিরোনামের কলামটির উপশিরোনাম ‘উইদাউট ক্রেডিবল ইলেকশনস, উই উইল নেভার অ্যাটেইন পলিটিক্যাল স্ট্যাবিলিটি’। বাংলায় যার অর্থ, ‘শুধু একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে’। আর বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়।
কলামের শুরুতে মাহফুজ আনাম বলেছেন, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের এক বছরের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা অনেকের কাছে আগাম মনে হতে পারে। কিন্তু সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় বিষয়টি এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে গঠিত হবে, তার কাঠামো কেমন হবে এবং সেটি কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে মাহফুজ আনাম আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। জামায়াত নিজেদের এই ব্যবস্থার মূল প্রবক্তা বলে দাবি করে। তবে তার বর্ণনায়, ১৯৯৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। একপর্যায়ে হরতাল, সংসদ বর্জন ও সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়।
বিরোধী দলগুলোর দাবি উপেক্ষা করে তৎকালীন বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে। পরে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে। একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনও রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন মাহফুজ আনাম। এরপর ১৯৯৬ সালের জুন, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়। এসব নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো বিভিন্ন অভিযোগ তুললেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধও ছিল। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর ফলে বিচারপতি কে এম হাসানের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের সন্দেহ ছিল, বিএনপি নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যেই এই পরিবর্তন এনেছে।
পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাতের একপর্যায়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও ওই সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। মাহফুজ আনাম এই অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের সিদ্ধান্তকেও সমালোচনা করেছেন মাহফুজ আনাম। তার বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তিনি মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকলে আওয়ামী লীগকে পরবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের সম্ভাবনাও মেনে নিতে হতো। তার দাবি, সংবিধান সংস্কারবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সুপারিশেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রস্তাব ছিল না। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তেই এই ব্যবস্থা বাতিল হয়।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও কলামে সমালোচনা করেছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক। তার মতে, এসব নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার ও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ। উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ দূর করা যাবে বলে শেখ হাসিনা যে ধারণা করেছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারণার ভুল প্রমাণ করেছে।
এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান নিয়েও আলোচনা করেছেন মাহফুজ আনাম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে। তবে রাজনৈতিক সম্মতি থাকলেই একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। এ জন্য এর গঠনপ্রক্রিয়া, ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল যেন নির্বাচনকালীন সরকারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদের ১৬ নম্বর দফার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ২১টি উপদফায় বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। যেসব রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে, নির্বাচনে তাদের ইশতেহার জনগণের সমর্থন পেলে সেই অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মাহফুজ আনাম।
তার মতে, এখন ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে বড় প্রশ্ন হলো, তারা নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কতটা আন্তরিক। কারণ, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়, যার অধীনে পরবর্তী নির্বাচনে নিজেদের পরাজয়ের আশঙ্কাও মেনে নিতে হবে। কিন্তু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য এই রাজনৈতিক মানসিকতা থাকা জরুরি।
কলামের শেষাংশে মাহফুজ আনাম লিখেছেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তার মতে, এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপরিপক্বতার পরিচয়। অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা কোনো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত থাকবে।
মাহফুজ আনামের এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং এমন একটি নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যার ওপর ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তার মতে, ক্ষমতাসীন দল যদি নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার নিশ্চয়তার পরিবর্তে জনগণের ভোটের ওপর আস্থা রাখতে পারে, তাহলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি সম্ভব। পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাও মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক মানসিকতা তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।
খবরটি শেয়ার করুন