ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র রমজান মাস চলছে। এমন সময় রাজনৈতিক দলগুলো মাসজুড়েই ইফতার পার্টির নামে নিজেদের দৃশ্যমান রাখে।পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট দলগুলো তাদের দলীয় কার্যালয়ে, বা ছোট-খাটো জায়গা ভাড়া করে এক সন্ধ্যার জন্য হলেও একটা জমায়াতের চেষ্টা করে। বড় দলগুলোর প্রায় প্রতিদিনই আয়োজন থাকে কোথাও না কোথাও।
এরও একটা রুটিন বা ফর্মুলা আছে। শুরু হয় অনাথ শিশু-কিশোরদের ডেকে এনে তাদের সঙ্গে ইফতার করে। সঙ্গে থাকেন আলেম-ওলামা। তারপর একে একে চলে দলের নানা স্তরের লোক, রাজনৈতিক জোটের সদস্য, কূটনীতিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আয়োজন। সাংবাদিকরা প্রতিটি আয়োজনেই আমন্ত্রিত থাকেন। তাদেরকে দাওয়াতের অন্যতম প্রধান কারণ, ইফতারের আয়োজন মানুষের কাছে প্রচার হওয়া।
রমজান মাসে দলীয় রাজনীতি চাঙ্গা করার পাশাপাশি জনদৃষ্টি আকর্ষণের কৌশল নেয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ইতোমধ্যেই তারা নামি-দামি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে ইফতার আয়োজন করছে। সামনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন টার্গেট করে এবার ইফতার পার্টিকে ঘিরে কিছু রাজনৈতিক দলের মধ্যে তোড়জোড় বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবারও জমজমাট ইফতার রাজনীতি।
রাজনৈতিক দলগুলো ইফতার মাহফিলের নামে মূলত একপ্রকার সমাবেশের আয়োজন করছে। এটিকে বলা যায়, ইফতার রাজনীতি। আয়োজক দলগুলো মূলত সমমনা ব্যক্তি, বা দলগুলোকে দাওয়াত দিয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, সৌজন্য দেখিয়ে প্রতিপক্ষ দলকে দাওয়াত দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব দলের প্রতিনিধি হাজির হন না।
এ বছর নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ইফতার পার্টি নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল। কারণ, তারা মানুষকে ‘পরিবর্তনের’ কথা বলে দল গঠন করেছে। তাদের ইফতার পার্টিতে পরিবর্তন তো দূরের কথা, অন্যান্য দলগুলো থেকে আরো একধাপ বেশি ‘আভিজাত্য’ দেখা গেছে।
মাত্র একমাস আগে গঠিত দলটি রাজধানীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইফতার আয়োজন করেছে। সেখানে রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক, সাংবাদিক, ছাত্র-শ্রমিক, পেশাজীবী ও সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে নিয়ে এনসিপি ইফতার পার্টির আয়োজন করে।
এখনও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধন হয়নি, এমন একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে পাঁচতারকা হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার আয়োজনে দেশের মানুষ চমকিত হয়েছেন। অনেকে প্রশ্ন করেছেন, এই রাজনৈতিক দলের বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের অর্থের উৎস কোথায়? রাজনৈতিক দল ও দাতা- উভয়েই স্বেচ্ছায় এ তথ্য প্রকাশ করা দরকার।
যদিও নতুন দলটি রাজনীতিতে পরিবর্তনের কথা বলছে, কিন্তু শুরুতেই দেখা গেলো, সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে তারা। তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল হবে কী করে?
আগামী সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে রমজান মাসের ইফতার ঘিরে যে নির্বাচনী হাওয়া বইছে, তাতে যেন শুধু রাজনীতি না হয়, জনগণের উদ্দেশে ইফতারের আয়োজন করা হয়। সেটির খরচের খাতও জনগণের সামনে পরিষ্কার করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত সদস্যদের চাঁদা ও অনুদান নিয়ে থাকে। এটি সব দেশের রাজনৈতিক দলের রীতি।
আবার অনেক সময় শুভাকাঙ্ক্ষীরাও অর্থ দিয়ে থাকেন। মোট কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনেও আর্থিক লেনদেন সম্পর্কিত তথ্যে এসবের উল্লেখ থাকতে হবে। কমিশন চাইলেই যেন তা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারে।
বেশ কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলো ইফতার পার্টির নামে সমাবেশের আয়োজন করে আসছে। রোজার মাসে সভা-মিছিল ইত্যাদির আয়োজন করার নানা অসুবিধা থাকায় ইফতার পার্টির মাধ্যমেই দলগুলো তাদের চাঙা রাখে এবং সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও ইফতার রাজনীতি জমে উঠছে।
এইচ.এস/