ছবি: সংগৃহীত
জামালপুরে উৎপাদিত কাঁচা মরিচ এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব মরিচ মালয়েশিয়ায় রপ্তানি শুরু হয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
জেলার বিস্তীর্ণ আবাদি জমিতে, বিশেষ করে চরাঞ্চলে কাঁচা মরিচের চাষ হয়। চলতি মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আবাদ ও উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবুও বাজারে দাম বেশি থাকায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখছেন।
জেলায় উৎপাদিত হাইব্রিড জাতের মরিচ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষকেরা স্থানীয় বাজারের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দাম পাচ্ছেন।
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে ৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ এবং ৮৬ হাজার ৩৬২ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে চাষ হয়েছে ৬ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে।
মাদারগঞ্জ উপজেলার গাবেরগ্রাম বাজারের ব্যবসায়ী মালেক মিয়া জানান, প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে মরিচ কিনছেন। স্থানীয় বাজারদরের চেয়ে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা বেশি দাম দিচ্ছেন। এসব মরিচ প্যাকেটজাত করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি কার্টুনে থাকে ৯ কেজি মরিচ।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ টন মরিচ রপ্তানি হয়েছে। স্থানীয় বাজারে যেখানে কেজিপ্রতি দাম ২৮ টাকা, সেখানে রপ্তানিযোগ্য মরিচের জন্য ৩৪ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় করেছেন।
এই রপ্তানি কার্যক্রম শুধু কৃষকদের ভালো দাম নিশ্চিত করছে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখছে। মালয়েশিয়ায় কাঁচা মরিচের চাহিদা থাকায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গুণগত মান বজায় রাখতে পারলে এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা আছে।
মাঠপর্যায়ের কৃষকদের কথায়ও উঠে এসেছে বাস্তবতা ও সম্ভাবনার মিশ্র চিত্র। কৃষক আবদুল রহিম বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এবার ফলন কম হয়েছে। তবে দাম বেড়েছে। ‘রপ্তানির কারণে আমরা ভালো দাম পাচ্ছি, এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক,’ বলেন তিনি।
আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সারের দাম বেড়েছে। ফলন ভালো না হলে খরচ উঠানো কঠিন। তবে রপ্তানির কারণে দাম কিছুটা ভালো, আশা করছি অন্তত খরচটা উঠে আসবে।’
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা কিছুটা চাপে থাকলেও রপ্তানির সুযোগ নতুন করে স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আগে যেখানে স্থানীয় হাটবাজারের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরিফ খান জানান, মাদারগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার কাঁচা মরিচ বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যক্তিগত রপ্তানিকারকের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই মান বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে কীটনাশকের ব্যবহার, গ্রেডিং, প্যাকেজিং এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যথাযথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে কৃষকরা আরও উন্নতমানের মরিচ উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এ খাতটি আরও প্রসারিত হবে।
সব মিলিয়ে, প্রতিকূল আবহাওয়া ও উৎপাদন ঘাটতির মাঝেও জামালপুরের কাঁচা মরিচ এখন নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের রপ্তানি খাতেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খবরটি শেয়ার করুন