ছবি: সংগৃহীত
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। ১৯৯১ সাল, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে বিএনপি। ওই সময় বিটিভিতে মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিতর্কিত এক বক্তৃতায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ (অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত নিষিদ্ধ সংগঠন)।
ওই বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের গাড়ি ভাঙচুর করেন ছাত্রলীগের তখনের নেতাকর্মীরা। এতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন খারাপ করেছিলেন।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে উপরের ঘটনাটির কথা উল্লেখ করেছেন।
নঈম নিজামের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এই পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে তার পোস্ট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নঈম নিজাম লেখেন, '১৯৯১ সালে সংসদ বিটের রিপোর্টার ছিলাম। দৈনিক আজকের কাগজের অফিস ছিল ঝিগাতলায়। এই কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে সম্পর্ক জমে ওঠে। তিনি থাকতেন ওই এলাকায়। ভীষণ আড্ডাবাজ একজন মানুষ। মুহূর্তে জমিয়ে নিতে পারতেন। সংসদ-বিষয়ক কোনো কিছু না বুঝলে তাকে ফোন করতাম যখন-তখন। তিনি বুঝিয়ে দিতেন।'
সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, 'সাংবিধানিক প্রশ্নে তার (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) দখল ছিল গভীর। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির প্রকৃত পার্লামেন্টারিয়ানদের একজন। ছিলেন স্পষ্টভাষী, রসিক, তর্কপ্রবণ বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। জীবন শুরু ন্যাপ দিয়ে হলেও বেলা শেষে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংসদীয় রাজনীতিতে তার তীক্ষ্ণ বক্তৃতা, সাংবিধানিক জ্ঞান ও রাজনৈতিক কৌশল ছিল আলাদা।'
আজ বৃহস্পতিবার (৫ই ফেব্রুয়ারি) নঈম নিজাম 'সুরঞ্জিত সেন, কালো বিড়াল, কঠিন বাস্তবতা' শিরোনামে নিজের ফেসবুক পোস্টে বলেন, '১৯৯৬ সালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যোগ দেন আওয়ামী লীগে। ওয়ান ইলেভেনের সময় দলের ভেতরে কথা বলার অধিকার চাইলেন। বললেন, হোক সবার মত প্রকাশ। তারপর আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদের মতো তিনিও পেলেন সংস্কারবাদীর তকমা। ২০০৯ সালে সংস্কারের দায়ে বাদ পড়লেন আমু, রাজ্জাক, তোফায়েলের মতো।'
তিনি বলেন, অন্যরা না ফিরতে পারলেও তিনি (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) ফিরলেন কোনোভাবে। তারপর বিতর্কিত মন্ত্রীদের কারো সমস্যা না হলেও আসমানি ডিজাইন অনুযায়ী তার এপিএসের গাড়ি ঢুকে যায় বিডিআরের হেড কোয়াটারে। কালো বিড়ালের তকমা নিয়ে বিদায় নেন রেলমন্ত্রীর পদ থেকে। জীবনের শেষ দিনগুলো ছিল বেদনায় সিক্ত।
সবশেষে নঈম নিজাম লেখেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। সারা জীবন লড়েছেন। সংসদে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তার বাহাস জমতো। সেই মানুষ শেষ বেলায় থাকতেন বিষন্ন। গতকাল ছিল তার শেষ বিদায়ের দিন। এই জীবনের সকল ক্লান্তিকে না বলে চলে যাওয়ার দিন। ভালো থাকুন সেন দা।
প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জ-২ আসন (দিরাই ও শাল্লা) থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৫ সালের ৫ই মে দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে জন্ম নেন। তার মৃত্যু হয় ২০১৭ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারের রেলমন্ত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কনিষ্ঠ সদস্য ও বিশিষ্ট সংসদ সদস্য হিসেবে তার পরিচিতি ছিল দেশে-বিদেশে। সুনামগঞ্জের মানুষ তাকে বলতেন, ‘ভাটি বাংলার নেতা’।
এদিকে আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে ২০২৪ সালের ২৩শে অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ছাত্রসংগঠনকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করতে সময় বেঁধে দেয়। তাদের নির্ধারিত সময়ের আগেই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।
খবরটি শেয়ার করুন