ছবি: সংগৃহীত
স্বাস্থ্য খাতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে ব্যাপক ‘দুর্নীতি’ হয়েছে দাবি করে তা তদন্ত করতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ ছাড়া আউটসোর্সিং বাদ দিয়ে দ্রুত শূন্য পদে জনবল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে আজ বুধবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন সুপারিশ করা হয়। কমিটির দুজন সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কমিটির সভাপতি এস এম রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, আব্দুস সালাম, আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, ইকরামুল বারী টিপু, আনোয়ারুল হক, শামীম আরা বেগম স্বপ্না, আব্দুল বারী সরদার এবং মাহমুদা আলম মিতু।
বৈঠক সূত্র বলেছে, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে, বিশেষ করে করোনার সময় স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতি হয়েছে—পিপিই কেনা, ভ্যাকসিন কেনা এবং পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্নীতির অভিযোগ ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে। এগুলোর সত্যতা কতটুকু, সত্য হলে তদন্ত করে কোনো প্রতিবেদন হয়েছে কি না—সেটা দেখা দরকার। তদন্ত না হয়ে থাকলে, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত কমিটি করে প্রতিবেদন তৈরি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
কমিটির সদস্য ইকরামুল বারী টিপু বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বিগত ১৭ বছরে, বিশেষ করে করোনাকালীন ও অন্যান্য সময়ে যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, সেগুলো তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের দুর্নীতি কেউ করতে না পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
আব্দুল বারী সরদার বলেন, ‘সে সময়ের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্তের সুপারিশ করেছি। তদন্ত করে যারা দোষী, তাদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে যাতে নতুন করে দুর্নীতি না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি।’
সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুর্নীতিমুক্তভাবে কার্যক্রম পরিচালনা ও ফ্যাসিস্টদের কার্যক্রমের বিষয়ে সজাগ থাকার পাশাপাশি হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বৈঠকে।
বৈঠকের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু অবকাঠামো বাড়ালেই লাভ নেই, সেবা দিতে হলে প্রয়োজনীয় জনবলও লাগবে। বিশেষ করে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে।
এ ছাড়া বদলির বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে নারী নার্সদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলের মেয়েদের দেশের দক্ষিণাঞ্চল, চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার এলাকায় বদলি করা হয়। এত দূরে গিয়ে তাঁদের চাকরি করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
হাসপাতালের আউটসোর্সিং নিয়োগের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগে দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আউটসোর্সিং পদ্ধতি বাদ দিয়ে দ্রুত শূন্য পদগুলোয় জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, ঠিকাদারের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ হতো। নেতারা তালিকা দিয়ে বলতেন, ‘এটা এটা নেওয়া লাগবে।’ দেখা যেত, একজন আয়া, একজন পিয়ন, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী—নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে ১ লাখ, ২ লাখ, ৩ লাখ টাকা করে নিয়ে ঠিকাদারের কাছে নাম দেওয়া হতো। ঠিকাদারও সেভাবে তাঁদের নিয়োগ দিতেন। আবার বেতন দেওয়ার সময় দেখা যেত, তাঁরা ১০ হাজার টাকা বেতন পাবেন, কিন্তু আগেই ৪ হাজার টাকা কেটে নিয়ে ৬ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে দুর্নীতি হতো।
ইকরামুল বারী টিপু বলেন, ‘আমরা দাবি করেছি, এই আউটসোর্সিং পদ্ধতি বাদ দিয়ে দ্রুত শূন্য পদগুলোয় জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক।’
আব্দুল বারী সরদার বলেন, ‘এতে দুর্নীতি হচ্ছে, এটা বন্ধ করা দরকার। তারাও (মন্ত্রণালয়) একমত হয়েছেন যে, সামনের বছর থেকে আর এভাবে নিয়োগ হবে না।’
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার পরিধি বাড়ানো এবং জেলা সদর হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) স্থাপনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ডায়ালাইসিস সেন্টার, ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম চালু রয়েছে।
বৈঠকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি গবেষণা, হাসপাতাল ও ঔষধালয়ের ব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ‘শিশু স্বর্গ’ স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সশস্ত্র আনসার মোতায়েন এবং হেলথ কার্ড প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথা জানানো হয়।
বিভিন্ন ধরনের টিকার মজুত পরিস্থিতি, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভবতী মায়েদের সেবা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্কুল স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিক জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে আরও সচেতন থাকার জন্য কমিটি সুপারিশ করে। সূত্র জানিয়েছে, সরকারের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকার মজুত আছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়। পরিবার পরিকল্পনার যেসব কার্যক্রম বন্ধ ছিল, সেগুলো আবার নতুন করে সক্রিয় করা হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন