ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
বাউল কবি মাতাল রাজ্জাক বাংলা লোকগানে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার আসল নাম মাতাল আবদুর রাজ্জাক দেওয়ান। অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের স্রষ্টা তিনি। মাতাল রাজ্জাক নানা বিষয় উপলক্ষ করে গান লিখেছেন। কোরআন নিয়েও তিনি গান লেখেন। তিনি গানে আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, আল কোরআনের মতো ‘বিশ্ববিজ্ঞান’ পেয়েও বাঙালি মুসলমানদের ভিক্ষা করার স্বভাব গেল না!
তিনি বলেন, ‘মূর্খ আলেম বাঙালিরা বাংলা বোঝে না’; কিন্তু ঠিকই তারা আরবি ভাষা রপ্ত করে শিক্ষিত হওয়ার দাবি হিসেবে ‘নেক কামাইলো পয়সা পাইলো খাইলো পরের ঘরে’। তিনি আরো বলেন, ‘ওরা ইসলামেরই দোহাই দিয়ে লাখে লাখে মানুষ মারে’। এছাড়া বাউল কবি মাতাল রাজ্জাকের গানে জঙ্গিবাদ সম্পর্কে সতর্কবাণী লক্ষ্য করা যায়। এমন বাণীতে- ‘ও বাঙালি হও রে সাবধান, যদি হও সত্য মুসলমান’। তিনি মূলত ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা জেনে নীতি ও আদর্শের সঠিক প্রয়োগের বিষয়ে সচেতনতার বাণী প্রচার করেছেন।
বাউল কবি মাতাল রাজ্জাকের গানে শুধু ধর্মের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী উচ্চারণ ছিল না; তিনি ভণ্ড বাউলদের বিরুদ্ধেও অনেক গান লিখেছেন। তার প্রতিবাদী উচ্চারণ-
‘আমি তো লাজে মরি কি যে করি গলায় দড়ি দিয়া
বিপদে পইড়াছি গো বড় বাউলা গান শিখিয়া।।
ভেবেছিলাম গানের জগৎ খুবই একটা ভালো
আমি গান শিখিব বাউল হবো জ্বালবো জ্ঞানের আলো।
দেখলাম বাউল হইয়া গানে গিয়া কপাল বড় পোড়া
এই গান গাইয়া বেড়ায় ইতর-ফাতরা যারা’।।
বাউল সম্প্রদায়ের অবক্ষয় সম্পর্কে তিনি করেছেন আত্মসমালোচনা। তিনি এটাও বলেছেন–
‘সাধু-মহৎ বাউল ছিল যত জ্ঞানী-গুণী
পালাইয়া গেছে তারা গানে নামছে খুনি
ওরা গায়ের জোরে মুরুব্বিরে করে অপমান
কথায়-কথায় তুইলা বহে হাদিস আর কোরআন’।
বাউলের বেশ ধরে যারা সাধারণ লোকজনকে বিভ্রান্তিতে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে বাউল মাতাল রাজ্জাক ছিলেন সর্বদা সোচ্চার। তাই তো বাউল সমাজের কলঙ্কদের বিরুদ্ধে তিনি এমন বাণী রচনা করতে বাধ্য হন। তিনি নারী বাউলদের মধ্যে যারা নকল ও ভণ্ড, তাদের সম্পকেও লিখেছেন-
‘আছে কিছু গানের মাইয়া অল্প বইসা ছেরি
বিয়া-শাদির ধার ধারে না জামাই গণ্ডা চারি’।
সাহিত্যমূল্য বিচার করলে বাংলা গানের অন্য বাউল শিল্পীর তুলনায় বাউল মাতাল রাজ্জাকের গান শুধু সুরে স্বাতন্ত্র্য নয়, বরং তা কবিত্বেও অনন্য।
তথ্যসূত্র: তপন বাগচী, লোকগানের খোঁজে, আলোকায়ন, ঢাকা, ২০০৬