ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
পুলিশপ্রধান বলছেন, প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে। কথাটি শুধু একটি বিতর্কিত বক্তব্য নয়; এটি দেশের সংবিধান, আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিকের জীবনের অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক একটি বিপজ্জনক বার্তা। যে দেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে, সেই দেশের পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা কীভাবে এমন একটি পদ্ধতি প্রয়োগের কথা বলেন, যার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির আজ সোমবার, ২৬ অক্টোবর, রাজধানীর চকবাজারে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’
কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্ন। আইন ও সংবিধান মেনে দায়িত্ব পালনের ঘোষণা দিয়ে একই সঙ্গে ক্রসফায়ারের কথা বলা যায় কি? সরকার অনুমতি দিলেই কি কাউকে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে হত্যা করার অধিকার তৈরি হয়? কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার ও শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কি সরকারের নির্বাহী নির্দেশে বদলে যায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট। সরকার আইন প্রয়োগের নির্দেশ দিতে পারে, আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দিতে পারে না। পুলিশের মহাপরিদর্শকও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অনুমোদনকে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিকল্প আইনি ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন না। কারণ, রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে আইন ও সংবিধান—কোনো সরকারের তাৎক্ষণিক ইচ্ছা নয়।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই রাষ্ট্রের হাতে তার জীবন কেড়ে নেওয়ার অবাধ ক্ষমতা চলে আসে না। অপরাধের অভিযোগের বিচার আদালতে হবে, শাস্তি নির্ধারণ করবে আইন। পুলিশ তদন্ত করবে, প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং আইন অনুযায়ী অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করবে। পুলিশ নিজে বিচারক, জল্লাদ ও নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে না।
অবশ্য, জীবন রক্ষা বা আসন্ন প্রাণঘাতী হামলা ঠেকাতে আইনসম্মত ও অপরিহার্য বলপ্রয়োগের প্রশ্ন আলাদা। পুলিশ আত্মরক্ষায় কিংবা অন্যের জীবন বাঁচাতে পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই সীমিত ক্ষমতাকে ‘ক্রসফায়ার’ নামের একটি কথিত পদ্ধতির সাধারণ অনুমোদন হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী হুমকি মোকাবিলা করা এবং কাউকে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য মুছে দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও এ ক্ষেত্রে দ্ব্যর্থহীন। জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের সহজাত জীবনের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ হতে হবে কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত। অপরাধ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ কিংবা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে কাউকে বিচার ছাড়াই হত্যা করার সাধারণ অনুমতি কোনো রাষ্ট্রের নেই।
দেশের ইতিহাসে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি কেবল একটি গোলাগুলির ঘটনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে এটি এমন বহু মৃত্যুর বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি ছিল, বন্দুকযুদ্ধে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহত হয়েছেন; কিন্তু স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ ছিল, নিহত ব্যক্তিকে আগে আটক করা হয়েছিল, গুম করা হয়েছিল অথবা হেফাজতে নির্যাতনের পর হত্যা করে ঘটনাটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করে সত্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু এই অভিযোগের ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করে ক্রসফায়ারকে অপরাধ দমনের স্বাভাবিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার কোনো সুযোগ নেই।
ক্রসফায়ার নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এ যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে আটক, নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। তখন সরকারের বক্তব্য ছিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধ দমনের জন্য অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু অপরাধ দমনের সেই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত মৃত্যুগুলোর দায় নির্ধারণের বদলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০৩ সালে প্রণীত দায়মুক্তি আইনটি পরবর্তী সময়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ওই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। আদালত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি প্রতিকার চাওয়ার পথও উন্মুক্ত রাখেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের খবর দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
এই রায় রাষ্ট্রের জন্য একটি মৌলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করে: আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে নির্বিচারে দায়মুক্তির আওতায় আনা যায় না। সরকার কোনো অভিযানের অনুমোদন দিলেই সেই অভিযানে সংঘটিত বেআইনি কাজ বৈধ হয়ে যায় না। বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা সরকারের দায়িত্ব।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটির পাশাপাশি ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ‘গুলিবিনিময়’ ও ‘গোলাগুলির সংঘর্ষ’ শব্দগুলোও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের সঙ্গে বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর এসব মৃত্যুর সংখ্যা ও ধরন নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ জানায়। সরকার মাদক ও অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও সেই লক্ষ্য অর্জনে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলে ধরে। সংস্থাটি সাতটি ঘটনা সরেজমিনে অনুসন্ধান করে আটক বা গুমের পর হত্যার অভিযোগ, আলামত ও সাক্ষ্য নিয়ে অনিয়মের আশঙ্কা এবং এসব মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের কয়েকটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও ঘটনার বিবরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ছিল।
একই বছরের ৭ জুন প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মাদকবিরোধী অভিযানে শতাধিক মৃত্যুর খবরের উল্লেখ করে স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানায়। সংস্থাটি স্পষ্ট করে যে মাদক একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হলেও তা মোকাবিলার নামে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা যাবে না; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যে থাকতে হবে।
এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলোর তাৎপর্য শুধু অতীতের কিছু ঘটনার সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখায়, অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত করার অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব দেশের ভাবমূর্তি, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর পড়ে। পুলিশ যদি আদালতের বাইরে শাস্তি দেওয়ার ধারণাকে গ্রহণযোগ্য বলে প্রচার করে, তাহলে অপরাধ দমনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত দেশের নিরাপত্তা খাত সংস্কারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারের ১৫ বছরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের অভিযোগ ছিল। সংস্থাটি জানায়, শত শত মানুষকে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় হত্যা করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বর্ণনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি সশস্ত্র সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বলা হলেও, অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে আগে আটক বা গুম করার অভিযোগ ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশ্রয়বিষয়ক সংস্থার ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে কথিত ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১ হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এটি কোনো আদালতের দেওয়া চূড়ান্ত রায় নয়; মানবাধিকার সংস্থার নথিভুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হিসাব। তবু সংখ্যাটি রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের অতীত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলার জন্য যথেষ্ট।
এখন প্রশ্ন হলো, যে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে এত অভিযোগ, যে দেশে অপারেশন ক্লিন হার্টের দায়মুক্তি আইন হাইকোর্টে অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে, যে দেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে, সেখানে পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক কেন আবার ক্রসফায়ারের সম্ভাবনাকে প্রকাশ্যে সামনে আনছেন?
তার বক্তব্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এখানে সরকারকে ক্রসফায়ারের বৈধতার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে হাজির করা হয়েছে। অথচ সরকার সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। সরকার অনুমতি দিলেও কোনো বেআইনি কাজ আইনসম্মত হয়ে যায় না। একইভাবে, পুলিশের কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমোদনকে ঢাল বানিয়ে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারেন না। নির্দেশদাতা ও নির্দেশ পালনকারী—উভয়ের দায় নির্ধারণের প্রশ্ন উঠতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকরভাবে কাজ করতে দিতে হবে—এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অপরাধী গ্রেপ্তার করতে হবে, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এসব কাজের কার্যকারিতা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বরং অপরাধের তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, দ্রুত বিচার, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভিত্তি।
আইজিপি বলেছেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ তাদের ফ্যাসিস্ট বলে, আর নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে। কিন্তু পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা থাকলেই ক্রসফায়ারের পক্ষে যুক্তি তৈরি হয় না। পুলিশের শক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যার সক্ষমতায় নয়; আইনের মধ্যে থেকে অপরাধ দমন এবং নিজের সদস্যদের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত করতে হবে, অভিযোগ মিথ্যা হলে প্রমাণের ভিত্তিতে তা খণ্ডন করতে হবে। সমালোচনাকে অপরাধ দমনের পথে বাধা হিসেবে দেখিয়ে আইনের সীমা শিথিল করার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্যের পর সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। সরকার কি ক্রসফায়ারকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি মনে করে? যদি না করে, তাহলে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাইবে কি? পুলিশ সদর দপ্তর কি জানাবে, ‘ক্রসফায়ার’ বলতে তিনি ঠিক কোন আইনসম্মত ব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন? আর যদি সরকার এমন কোনো অনুমতির কথা ভেবে থাকে, তবে সেই অনুমতির আইনগত ভিত্তি কোথায়?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন আইনি ব্যাখ্যা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড না ঘটার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা।
দেশের মানুষ অপরাধমুক্ত সমাজ চায়, কিন্তু সেই সমাজ প্রতিষ্ঠার নামে রাষ্ট্রের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার লাইসেন্স তুলে দিতে চায় না। অপরাধী যত ভয়ংকরই হোক, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আইনি অধিকার রক্ষা করা। ন্যায়বিচারের এই নীতি অপরাধীর প্রতি অনুকম্পা নয়; এটি নাগরিকের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক অঙ্গীকার।
অতীতের ক্রসফায়ার সংস্কৃতি দেশকে যে মানবাধিকার সংকট ও জবাবদিহির প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে সেই শব্দকে আবার সরকারি বক্তব্যে ফিরিয়ে আনা উদ্বেগজনক। পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য শুধু একটি বাহিনীর অবস্থান নয়, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের দর্শন সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
ক্রসফায়ার কোনো আইন নয়, আদালতের রায় নয়, অপরাধ দমনের স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ক্ষমতাও নয়। সরকার অনুমতি দিলেই তা বৈধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা সংবিধানের শাসনের পরিপন্থী। পুলিশের মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব হলো আইন ও সংবিধানের সীমা রক্ষা করা, সেই সীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা ঘোষণা করা নয়।
খবরটি শেয়ার করুন