ফাইল ছবি
১৭ বছর নির্বাসন কাটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং এর অল্প কিছু সময় পর তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের সমীকরণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ দুই ঘটনা জিয়া পরিবারের প্রতি সহানুভূতির জোরালো স্রোত তৈরি করবে, যা নির্বাচনের আগে বিএনপির জনসমর্থন আরো শক্তিশালী করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। হংকংভিত্তিক গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ছাত্র-জনতার নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটাই দেশের প্রথম নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বিএনপি আরো সুসংহত অবস্থানে উঠে আসছে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ সেই অবস্থানকে দলীয় কর্মী-সমর্থক এবং বিশেষ করে সহানুভূতিশীল ভোটারদের মধ্যে মানসিক ও আবেগের দিক থেকে আরো সুদৃঢ় করবে। অনেকে একে বিএনপির পক্ষে সহানুভূতির ঢেউ সৃষ্টি হওয়ার একটি অনুকূল পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব এবং ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন—সব মিলিয়ে এ নির্বাচন বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, বরং নেতৃত্বের প্রশ্নে এক সুস্পষ্ট বার্তাও দিয়েছে। অনেকের কাছে তিনি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী।
এ বিষয়ে লন্ডনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, ‘মনে হচ্ছে তিনি (খালেদা জিয়া) যেন ছেলের ফেরার অপেক্ষা করছিলেন। তার মৃত্যু নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ঘটনা, তবে তা আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে স্পষ্ট সুবিধা এনে দেবে।’ তার মতে, খালেদা জিয়ার প্রয়াণ-উত্তর আবেগ রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগেই তারেকের প্রতি জনসমর্থনের ঢেউ দেখা গেছে। খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার কারণে ভোটারেরা মানসিকভাবে এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। মায়ের মৃত্যু হোক আর না হোক, তারেকই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন।’
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তরুণ ভোটাররাই এবার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ২৪ বা তার কম। যা নির্বাচনী ফলাফলে তরুণদের সম্ভাব্য প্রভাবকে স্পষ্ট করে। শ্রীরাধা দত্তের মতে, এ তরুণ প্রজন্মের প্রধান প্রত্যাশা হলো ভালো শাসন ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপির রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশলে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন হবে পরবর্তী সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যার মধ্যে থাকবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে দলটির সম্ভাব্য বিক্ষোভ মোকাবেলা করা এবং পুলিশ বাহিনীর ব্যাপক সংস্কার।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের দিকে গভীর নজর রাখবে ভারত। গত বছরের বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে চলে যাওয়ার পর থেকে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েন বেড়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে।
এর পরও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন দুই দেশের জন্যই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করছে।
গত মঙ্গলবার (৩০শে ডিসেম্বর) শোকবার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তার পরিবার এবং বাংলাদেশের সব মানুষের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা রইল। সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা যেন তার পরিবারের সদস্যদের এ শোক সইবার শক্তি দান করেন।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা সফর করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ও ক্ষমতা বিন্যাসের পর ভারত নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী থাকবে। এমনকি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তা কোনো সমস্যা করবে না বলে মনে করেন শ্রীরাধা দত্ত। তিনি বলেন, ‘দিল্লি ঢাকায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করার চেয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করাটাই তাদের কাছে ভালো বিকল্প।’
খবরটি শেয়ার করুন